২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যা জলবায়ু সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকা—একাধিক অঞ্চলে এই বছর বন্যা ছিল সবচেয়ে বড় জলবায়ু বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন ও প্রস্তুতি না নিলে ২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
গাজাইসরায়েলি আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য বন্যা ও তীব্র শীত নতুন বিপর্যয় ডেকে এনেছে। টানা ভারী বৃষ্টি ও ঠান্ডায় অন্তত ১৪ ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে এক নবজাতকও ছিল।
মরক্কো২০২৫ সালে দেশটিতে হঠাৎ বন্যায় অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহু ঘরবাড়ি ও দোকান। দুর্বল অবকাঠামো ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতি তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন>>এশিয়ায় হঠাৎ দুর্যোগের ঘনঘটা, দেশে দেশে বাড়ছে প্রাণহানিবন্যায় এশিয়ার ৪ দেশে দেড় হাজার প্রাণহানি, আতঙ্ক বাড়াচ্ছে বৃষ্টির পূর্বাভাসএশিয়ায় এবারের বন্যা এত ভয়ংকর হয়ে উঠলো কেন, কীসের ইঙ্গিত?
ইন্দোনেশিয়াডিসেম্বরে ভয়াবহ বন্যায় আচেহ ও সুমাত্রা অঞ্চলে নিহত হয়েছেন অন্তত ৯৬১ জন। বন উজাড় ও অবৈধ কাঠ কাটাকে বিপর্যয়ের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কাথাইল্যান্ডে বন্যায় প্রাণ গেছে অন্তত ২৭৬ জনের। শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’র প্রভাবে বন্যা ও ভূমিধসে নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৬ জন।
নেপাল ও ভারতঅক্টোবরে নেপাল ও ভারতের দার্জিলিং অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়। তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হলেও অতিমাত্রায় স্থানীয় ভারী বৃষ্টির কারণে ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক।
পাকিস্তানজুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বন্যায় নিহত হয়েছেন ৭০০ জনের বেশি। পাঞ্জাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বন্যা ও আকস্মিক বন্যায় মৃত্যু হয়েছে ২৪২ জনের। শুধু টেক্সাসেই জুলাই মাসের বন্যায় প্রাণ গেছে শতাধিক মানুষের।
আগের বছরের তুলনায় কতটা ভয়াবহবিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা ও প্রাণহানির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় ২০২৫ সাল আগের কিছু বছরের তুলনায় খুব বেশি ব্যতিক্রমী নয়, বরং নগরায়ণ ও দুর্বল পরিকল্পনার কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে।
কেন এত ভয়াবহ হলো বন্যাবন্যার বিধ্বংসী রূপের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন গবেষকেরা। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, নদী দখল, বন উজাড় ও অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাইয়ের মতে, এটি ছিল চরম আবহাওয়া ও দীর্ঘদিনের মানবিক ভুল সিদ্ধান্তের ফল। আমরা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জায়গায় শহর গড়ে তুলেছি, ফলে বৃষ্টি হলেই তা ভয়াবহ বন্যায় রূপ নিচ্ছে।
ভবিষ্যতের করণীয়বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বরং বন্যার সঙ্গে বসবাসের উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নদীকে জায়গা দিতে হবে, উন্নত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তাদের মতে, ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে ২০২৬ সালেও বিশ্বকে একই ধরনের বা আরও ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/