সদ্য শেষ হলো ২০২৫ সাল। নতুন বছর ২০২৬-কে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ব। বিদায়ী বছরে প্রযুক্তি খাতে একের পর এক এমন ঘটনা ঘটেছে, যা বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এসব ঘটনায় যেমন ছিল যুগান্তকারী উদ্ভাবন, তেমনি ছিল প্রযুক্তির ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ এবং নীতিগত নানা প্রশ্ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা, স্মার্টফোন উৎপাদন থেকে ডিজিটাল অর্থনীতি ২০২৫ সাল প্রযুক্তি বিশ্বে বড় পরিবর্তন ও বিতর্কের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
চলুন ফিরে দেখি ২০২৫ সালে প্রযুক্তি খাতে কোন কোন বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল-
এআই বিপ্লব ও কর্মক্ষেত্রে প্রভাব২০২৫ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছায়। লেখালেখি, কোডিং, ডিজাইন, কাস্টমার সাপোর্ট, সাংবাদিকতা ও শিক্ষা-সব ক্ষেত্রেই এআই হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। বাংলাদেশেও করপোরেট অফিস, আইটি ফার্ম, স্টার্টআপ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চ্যাটজিপিটি, ডিপসিক, কো-পাইলটসহ বিভিন্ন এআই টুল ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তবে একই সঙ্গে এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, দক্ষতা পরিবর্তনের চাপ এবং নতুন স্কিল অর্জনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সারা বছর আলোচনা চলতে থাকে।
ডিপফেক ও ভুয়া কনটেন্টে উদ্বেগএআইয়ের নেতিবাচক দিক হিসেবে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ডিপফেক প্রযুক্তি। রাজনৈতিক বক্তব্য নকল, ভুয়া সাক্ষাৎকার এবং বিভ্রান্তিকর ভিডিও-অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও নির্বাচন, রাজনীতি ও সামাজিক ইস্যুতে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্তকরণ এবং ফ্যাক্টচেকিংয়ের গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। বিশেষজ্ঞরা একে ডিজিটাল গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন।
সাইবার নিরাপত্তা ও ডাটা সুরক্ষা সংকট২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বড় বড় সাইবার হামলা, ডাটা লিক ও র্যানসমওয়্যার আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স এবং সরকারি ডিজিটাল সেবায় সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের দাবি ওঠে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা নিয়েও আলোচনা তীব্র হয়।
এআই ডাটা সেন্টার২০২৫ সালে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলোর বড় অংশজুড়ে ছিল ‘এআই ডাটা সেন্টার’। মাইক্রোসফট, ওপেনএআই, এনভিডিয়া, গুগল, মেটা ও ওরাকলের মতো প্রতিষ্ঠান জিপিইউ, ক্লাউড সার্ভিস ও বিশাল ডাটা সেন্টারে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এসব বিনিয়োগ এআই অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দেয়।
স্মার্টফোন ও লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে আসে বড় পরিবর্তন। ফোল্ডেবল ফোন, এআই ক্যামেরা, মেকানিক্যাল জুম ও উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি আলোচনায় থাকে। বাংলাদেশে স্মার্টফোন আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং দেশীয় অ্যাসেম্বলি ও ম্যানুফ্যাকচারিং উৎসাহিত করার উদ্যোগ বাজারে প্রভাব ফেলে। ফলে দেশীয় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির সরাসরি বিনিয়োগের আগ্রহও বাড়ে।
এনইআইআর বাস্তবায়ন ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে টানাপোড়েন২০২৫ সালে দেশের প্রযুক্তি খাতে আলোচিত আরেকটি বিষয় ছিল এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার) বাস্তবায়ন। সিস্টেমটি চালু নিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলে। সরকার বাস্তবায়নে অনড় থাকলেও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কারণে আপত্তি জানান। এই দ্বন্দ্ব প্রযুক্তি খাতে আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও ক্যাশলেস অর্থনীতি২০২৫ সালে ক্যাশলেস লেনদেন বিশ্বজুড়ে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কিউআর কোড পেমেন্ট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রতারণা, হ্যাকিং ও ভুয়া লেনদেনের ঘটনাও বাড়ে, যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি ও সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এআই রেগুলেশন ও ডিজিটাল আইনবিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই ব্যবহারে নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন ২০২৫ সালের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল। বাংলাদেশেও এআই, ডাটা প্রাইভেসি ও ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় আলাদা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী আইন না হলে প্রযুক্তির সুফল যেমন পাওয়া যাবে না, তেমনি ঝুঁকিও বাড়বে।
শিক্ষা ও মিডিয়ায় প্রযুক্তির প্রভাবএআইভিত্তিক শিক্ষা, অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারে ২০২৫ সালে বড় পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই দিয়ে পড়াশোনা ও অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির প্রবণতা বাড়ে, যা একাডেমিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদিক অনলাইন মিডিয়ায় অ্যালগরিদম পরিবর্তনের কারণে আয় ও টিকে থাকার সংকটও আলোচনায় আসে।
ইন্টারনেট সেবার নতুন গাইডলাইনবিগত বছরে ইন্টারনেট সেবার নতুন গাইডলাইন সংস্কারের দাবিতে সরব ছিল ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি)। সংগঠনটি দাবি করে, বিটিআরসির প্রস্তাবিত নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ইন্টারনেটের দাম বাড়বে এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা সংকটে পড়বেন। এ নিয়ে সারা বছর জুড়েই আলোচনা ও বিতর্ক চলেছে।
এছাড়া অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ, সিম নিবন্ধন, টেলিকম উদ্যোক্তাদের সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়েও ২০২৫ সাল ছিল আলোচিত। তবে বলা যায়, ২০২৫ সাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ছিল একদিকে সম্ভাবনার, অন্যদিকে সতর্কতার বছর। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, অর্থনীতিতে গতি এনেছে; তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও দক্ষতা উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে।
আরও পড়ুন২০২৫ সালে গুগলে যে ৫ বিষয় সবচেয়ে বেশি সার্চ হয়েছেকী কী কারণে মেটা ফেসবুক আইডি-পেজ সরিয়ে দেয়
শাহজালাল/কেএসকে