ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। যাচাই শেষে ১০১ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ব্যাংক ঋণ ও ঋণখেলাপি হওয়া, দলীয় মনোনয়ন না থাকা, দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা, এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি, হলফনামা ও আয়কর সংক্রান্ত তথ্য ঘাটতি এবং নির্বাচন বিধিমালা লঙ্ঘনের কারণে এসব মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিদ্রোহী প্রার্থী শাহীদুল ইসলাম চৌধুরীর দলীয় মনোনয়ন না থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টি (জাকের) প্রার্থী মোহা. এরশাদ উল্ল্যাহ নিজেই নিজের প্রস্তাবকারী হওয়ায় নির্বাচনি বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে তার মনোনয়নও বাতিল হয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আশরাফ ছিদ্দিকির ১ শতাংশ ভোটারের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে ৪ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আক্তার, আহমদ কবির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এইচ এম আশরাফ বিন ইয়াকুব এবং গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান। তাদের মধ্যে জিন্নাত আক্তার প্রদত্ত ১ শতাংশ ভোটারদের মধ্যে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে ১০ জনকে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে আটজনই সাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাই তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। আহমদ কবিরের ১২ (ক-১) ধারা অনুসারে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর না থাকায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এইচ এম আশরাফ বিন ইয়াকুব দলীয় মনোনয়ন ও হলফনামা না দেওয়ায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী রবিউল হাসানের সমর্থনকারীর স্বাক্ষর না থাকায় এর জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ ছালাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন। এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের মনোনয়ন দাখিল করেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ ছালাম। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জিএম কাদেরের স্বাক্ষরিত প্রার্থীকে দলীয় প্রার্থী হবেন বলে জানানো হয়। রুহুল আমিনের স্বাক্ষরিত মনোনয়ন দেওয়ায় তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ঋণখেলাপী ও ১ শতাংশ প্রদত্ত স্বাক্ষরের মধ্যে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে যাচাই করা ১০ জন ভোটারই স্বাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন দ্বৈত নাগরিক বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমেরিকান গ্রিনকার্ড দাখিল করেননি। সর্বশেষ ভ্রমণের তথ্যসহ রোববার বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। সময়মতো তথ্য দাখিল না করায় মনোনয়ন বাতিল বলে গণ্য করা হয়।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে ১ শতাংশ ভোটারের সঠিকতা প্রতীয়মান না হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. নুরুর রশিদ, চট্টগ্রাম-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন সঠিক না হওয়ায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ১ শতাংশ ভোটারের দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে যাচাই প্রক্রিয়া সঠিক প্রমাণিত না হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি নেত্রী শাকিলা ফারজানা, বিএনপি নেতা এস এম ফজলুল হক, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিন রিয়াদের মনোননয়পত্র অবৈধ ঘোষণা করেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে ৫ জন প্রার্থীর মধ্যে কারো মনোনয়নপত্রই বাতিল করা হয়নি।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে সমর্থনকারীর স্বাক্ষর না থাকা, আয়কর নথির তথ্য না থাকা, ফরম-২০ ও ফরম-২১ এ তথ্য না থাকার কারণে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী মো. আব্দুর রহমান, দলের সঠিক মনোনয়ন ও অঙ্গীকারনামা দাখিল না করায় গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. বেলাল উদ্দিন ও দলের মনোনয়ন সঠিক না থাকায় বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রমোদ বরন বড়ুয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম - ৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. সেহাব উদ্দীনের দলীয় মনোনয়নে নমুনা স্বাক্ষর গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আজাদ চৌধুরীর ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন না থাকায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। প্রার্থীর হলফনামায় স্বাক্ষর করেননি, আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি এবং ফরম-২১ সঠিকভাবে পূরণ না করায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আবদুল মোমেন চৌধুরী, দৈবচয়নে যাচাইকৃত ১০ জন ভোটারের মধ্যে কারো তথ্য না পাওয়ায় ও নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কোনো প্রমাণপত্র দাখিল না করায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলন কান্তি শর্মা এবং হলফনামায় শিক্ষা সনদের সাথে মিল না পাওয়ায়, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঋণখেলাপি ও সিটি করপোরেশন কর্তৃক বিল খেলাপি হওয়ায় নাগরিক ঐক্যের মো. নুরুল আবছার মজুমদারের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-খুলশি) আসনে হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকায় বাতিল হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী ওসমানের। জামানতের টাকা না দেওয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিল হয় বাংলাদেশ লেবার পার্টির প্রার্থী ওসমান গণির। ইনকাম ট্যাক্স জটিলতায় মনোনয়ন বাতিল হয় জাতীয় পার্টির প্রার্থী মুহাম্মদ এমদাদের। এছাড়া, এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর না থাকায় দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী ওমর ইউসুফ খাঁন ও মোহাম্মদ আরমানের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
চট্টগ্রাম-১১ আসনে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহাঙ্গীরের দাখিল করা এক শতাংশ ভোটারের মধ্যে ১০ জন ভোটারকে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে পাঁচজনের ঠিকানা সঠিক ও পাঁচ জনের ঠিকানা সঠিক ছিল না। যা যাচাই বিধিমালা-১১ অনুসারে মনোনয়ন বাতিল হিসেবে গণ্য হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নুর উদ্দিনের দলীয় মনোনয়ন ফর্মে প্রার্থীর নাম, ভোটার নম্বর ও নির্বাচনি এলাকা উল্লেখ ছিল না। তাই বাতিল করা হয়েছে। গণঅধিকার পরিষদের মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীনের কাছে সিটি করপোরেশনের ৯৭ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। যা পরিশোধ করা হয়নি। তাই তার মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এছাড়াও, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এ কে এম আবু তাহের ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপি, দলীয় মনোনয়ন নেই এবং সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স আপডেট না থাকায় মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে ঋণখেলাপির দায়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী এম. এয়াকুব আলীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এছাড়া দলীয় মনোনয়নপত্রের সত্যতা যাচাই না হওয়ায় জাতীয় পার্টি (জেপি) প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলামের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী শাখাওয়াত হোসাইন এবং কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা সৈয়দ সাদাত আহমদের মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) সংসদীয় আসনে বিএনপি নেতা আলী আব্বাস নিজেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিলেও দলীয়ভাবে কোনো অনুমোদিত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়নি। এছাড়া, তিনি নিজে নিজেকে প্রস্তাবকারী করার কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। অন্যদিকে, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. মুজিবুর রহমান ঋণখেলাপি হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে দ্বৈবচয়নে ১ শতাংশ ভোটারের সত্যতা না থাকায় দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী ও মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ারের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসনে ৫ জন প্রার্থীর মধ্যে কারোরই মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়নি।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮ জনের মনোনয়ন বৈধ এবং ১ জনের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। মূল হলফনামায় ও অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর না করায় গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আরিফুল হক তায়েফের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া, বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করা হয় চট্টগ্রাম-১ আসনে ৭ জন, চট্টগ্রাম-২ আসনে ৫ জন, চট্টগ্রাম-৩ আসনে ২ জন, চট্টগ্রাম-৪ আসনে ৯ জন, চট্টগ্রাম-৫ আসনে ৬ জন, চট্টগ্রাম-৬ আসনে ৫ জন, চট্টগ্রাম-৭ আসনে ৬ জন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে ৭ জন, চট্টগ্রাম-৯ আসনে ৮ জন, চট্টগ্রাম-১০ আসনে ৬ জন, চট্টগ্রাম-১১ আসনে ৮ জন, চট্টগ্রাম-১২ আসনে ৭ জন, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে ৭ জন, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ৭জন, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ৩ জন, ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনে ৮ জন।
জেল প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে আমরা বিন্দুমাত্র ছাড় দেবো না। আন্তর্জাতিক মহলে আমরা দেখিয়ে দিতে চাই আমরাও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে পারি। সব প্রার্থীর প্রতি অনুরোধ থাকবে যে, নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত যেন তারা আচরণবিধি মেনে চলেন।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। তিনি সব প্রার্থীকে আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।
এমআরএএইচ/এএমএ/এমএস