বিয়ে শুধু সামাজিক বন্ধনই নয়, এটি ঘিরে গড়ে ওঠে নানামাত্রিক রীতিনীতি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির জটিল বুনন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিয়েকে কেন্দ্র করে নানা বিচিত্র প্রথা দেখা যায়, যেগুলোর কিছু আমাদের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। এমনই একটি অদ্ভুত শোনালেও প্রচলিত রীতি রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে, যেখানে নবদম্পতিকে বিয়ের পর পুরো ৭২ ঘণ্টা অর্থাৎ তিন দিন টয়লেট ব্যবহার না করার নিয়ম মানতে হয়।
এই প্রথাটি মূলত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপ অঞ্চলে বসবাসকারী তিদোং নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের অংশ। এই প্রথা নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যতম ব্যতিক্রমী বিবাহরীতি। তবে তিদোং জনগোষ্ঠীর কাছে এটি শুধু নিষেধাজ্ঞা নয় বরং সংসারজীবনের পবিত্রতা, ধৈর্য, বোঝাপড়া ও স্থায়ীত্বের প্রতীক।
তিদোংরা মূলত সাবাহ, কালিমান্তান ও আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী একটি অস্ট্রোনেশীয় নৃগোষ্ঠী। এদের জীবিকা ঐতিহাসিকভাবে কৃষি, মাছধরা ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। পরিবার, বিবাহ ও বংশপরম্পরা এদের সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিদোংদের বিয়েতে তাই শুধু দু’জন মানুষের বন্ধন নয়, বরং দুটি পরিবার, এমনকি কখনো কখনো দুটি গ্রাম বা সম্প্রদায়ের মধ্যকার সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও বিবাহকে দেখা হয়।
এই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর নবদম্পতিকে একটি নির্দিষ্ট ঘরে রাখা হয়। সেখানে তারা বাইরে যেতে পারে না, কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করতে পারে না এবং সবচেয়ে কঠোরভাবে মানা হয় টয়লেট ব্যবহার করা যাবে না। এই তিন দিনে নবদম্পতির খাদ্য ও পানীয় গ্রহণও নিয়ন্ত্রিত থাকে, যাতে শারীরবৃত্তীয় চাহিদা কম হয়। তাদের আত্মীয়স্বজন সবসময় নজরদারি করেন যাতে কেউ নিয়ম ভঙ্গ না করতে পারে।
এত কঠিন নিয়ম কেন? তিদোং সমাজে বিশ্বাস করা হয় বিয়ের পর প্রথম তিন দিন যদি নবদম্পতি টয়লেট ব্যবহার না করে, তাহলে তাদের দাম্পত্যজীবন হবে দীর্ঘ, শান্তিপূর্ণ ও কলহমুক্ত। যারা নিয়ম ভঙ্গ করে, তাদের সংসারে অশান্তি, দুর্ভাগ্য বা বিচ্ছেদের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে যারা সফলভাবে এই তিন দিন পার করেন, তাদের সংসারকে আশীর্বাদপুষ্ট বলে মনে করা হয়।
নৃগবেষণা অনুযায়ী, এই রীতির শিকড় কয়েকশ বছর আগে। সে সময়ে বিয়ে ছিল পরিবারগত জোটের প্রতীক। নবদম্পতির সম্পর্ককে পবিত্র ও অচ্ছেদ্য রাখতে কিছু ‘শপথমূলক আচার’ প্রচলিত হয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সাংস্কৃতিক রীতি হয়ে ওঠে। এই ৭২ ঘণ্টার টয়লেট নিষেধাজ্ঞাকেও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
তবে এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি অনস্বীকার্য। দীর্ঘ সময় প্রস্রাব বা মলত্যাগ দেরি করা শারীরিকভাবে ক্ষতিকর এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। তাই আধুনিক সময়ে অনেক তিদোং পরিবার এই নিয়ম শিথিলভাবে অনুসরণ করেন। কেউ কেউ প্রতীকীভাবে স্বল্পসময়ের জন্য পালন করেন, আবার প্রয়োজনে নিয়ম ভেঙে টয়লেট ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়।
তিদোং সমাজে এই ৭২ ঘণ্টার সময়টিকে শুধু নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি নতুন জীবনের প্রতীকী সূচনা। নবদম্পতির পারস্পরিক ধৈর্য, সহনশীলতা ও মানসিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও এই রীতিকে মূল্যায়ন করা হয়। পরিবার ও সম্প্রদায়ের আশীর্বাদে তাদের বিবাহিত জীবনের ভিত্তি শক্তিশালী হয় বলেও বিশ্বাস করা হয়।
বাইরের সমাজের দৃষ্টিতে এই প্রথাটি নিছক অদ্ভুত কিংবা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক সংস্কৃতির নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। এগুলো তাদের ইতিহাস, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই কেবল আমাদের মানদণ্ডে বিচার না করে তাদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে বোঝাটাই যুক্তিসঙ্গত।
আধুনিক শিক্ষা, ইন্টারনেট ও বৈশ্বিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে তিদোং সমাজেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর এই নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করে না। তবুও এটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। কারণ এটি তাঁদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য এবং বিয়ের উৎসবমুখর আবহের এক অংশ হিসেবে এখনও টিকে আছে।
আরও পড়ুনগ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিয়ের আয়োজন কি হারাতে বসেছেযেখানে সবাই মেলায় জীবনসঙ্গী খোঁজে, বিয়ের আগেই মা হয় মেয়েরা
সূত্র: মিডিয়াম
কেএসকে