গণমাধ্যম

নতুন বছর সাংবাদিকদের জন্য আরও ভয়ংকর হতে পারে

বাংলাদেশ এখন ট্রানজেশনাল সিচুয়েশন বা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকতাও তেমনি এক ভীতিকর পরিবর্তনের মুখে। আগের মতো সাংবাদিকতা পেশা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন বছর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য আরও ভীতিকর ও ভয়ংকর হতে পারে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তির প্রভাব এবং সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে এসব কথা বলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত মিনহাজ।

সম্প্রতি ইউনেস্কো এবং আইডিওসিঙ্ক মিডিয়া কম্বাইনের যৌথ উদ্যোগে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের সক্ষমতা নিয়ে ‌‘ঝুঁকি, সহনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ: ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সক্ষমতাবিষয়ক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অংশের কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকতা বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও লিখেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক।

জাগো নিউজ: নতুন বছরে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে দেখছেন?

রাহাত মিনহাজ: বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় আতঙ্কের এক নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর রাতে আমরা দেখলাম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে আগুন দেওয়া হলো, অথচ রাষ্ট্র সেখানে নির্বিকার ভূমিকা পালন করলো। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন ভিন্ন কথা, আমাদের এখন বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে গেছে। আমরা যেন এক হত্যার যুগে প্রবেশ করেছি।’

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা এবং সমাজে যে ধরনের নৈরাজ্য দেখছি, তাতে ২০২৬ সালে সাংবাদিকতা আরও কঠিন হতে পারে। এটি অনেক ক্ষেত্রে রক্তাক্ত হতে পারে, সাংবাদিকদের অনেক রক্ত ঝরতে পারে। বিশেষ করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। এই নির্বাচন কেন্দ্র করে বহু সাংবাদিক প্রাণ হারাতে পারেন বলে আমি গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছি।

জাগো নিউজ: প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া সাংবাদিকতার ধরনকে কতটা বদলে দিচ্ছে?

রাহাত মিনহাজ: জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী দেশ। ফলে আমাদের সাংবাদিকতায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ আর টেলিভিশনে সংবাদ দেখে না, সবাই স্মার্টফোনে অভ্যস্ত। একটা সময় আমরা বসে টেলিভিশন দেখতাম বা টকশো শুনতাম, সেই যুগ এখন শেষ। মানুষ এখন তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে মোবাইল ফোনের ছোট স্ক্রিনেই সবকিছু দেখে। ফলে বাংলাদেশের সম্প্রচার সাংবাদিকতা ও ছাপা সংবাদপত্র ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে।

ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম লার্জেস্ট ‘ফেসবুক সিটি’। মানুষ খবরের প্রাথমিক উৎস হিসেবে ফেসবুককেই বেছে নিচ্ছে। আগামী বছর টেলিভিশন সাংবাদিকতার দর্শক আরও কমবে এবং মানুষ পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক হয়ে পড়বে।

জাগো নিউজ: প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কোন কোন দক্ষতা জরুরি?

রাহাত মিনহাজ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলরেডি আমাদের সমাজে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়া চলা এখন অসম্ভব। বাংলাদেশে অনেক সংবাদমাধ্যম এরই মধ্যে ছবি সম্পাদনা, ভিডিও এডিটিং বা বিগ ডেটা থেকে সংবাদ প্রসেস করার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতা নিচ্ছে। সাংবাদিকদের জন্য এই প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এখন অপরিহার্য। কেউ যদি মনে করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা না শিখে সাংবাদিকতা করবেন, তবে তা সম্ভব নয়। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাংবাদিকতা করার কলাকৌশলগুলোও দ্রুত রপ্ত করতে হবে।

জাগো নিউজ: নিউজরুমে ডিজিটাল ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার প্রবণতা কি প্রথাগত সংবাদপত্রকে চাপে ফেলবে?

রাহাত মিনহাজ: মানুষ এখনো এক কাপ চায়ের সঙ্গে ছাপা কাগজ পড়ার আনন্দ উপভোগ করে। তবে এ অভ্যাস যে ধীরে ধীরে কমবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ডিজিটাল মিডিয়া অবশ্যই প্রথাগত মাধ্যমকে বড় ধরনের চাপে রাখবে।

জাগো নিউজ: নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য ডেটা জার্নালিজম বা মোবাইল জার্নালিজমের গুরুত্ব কেমন?

রাহাত মিনহাজ: বর্তমান সাংবাদিকতায় মোবাইল জার্নালিজম, সোশ্যাল মিডিয়া জার্নালিজম বা মেটা জার্নালিজমের মতো নতুন টার্ম যুক্ত হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা মানে নিজেরই ক্ষতি করা। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য এসব প্রযুক্তির ব্যবহার শেখা অত্যন্ত জরুরি।

জাগো নিউজ: ভুয়া খবর ও তথ্য যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ নতুন বছরে কতটা বাড়তে পারে?

রাহাত মিনহাজ: আমাদের দেশে মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম সচেতনতা অনেক কম। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বানানো ফটোকার্ড দিয়ে চারপাশ সয়লাব। এমনকি বড় একটি দলের প্রধানের দেশে ফেরার ছবিও অনেক গণমাধ্যম এডিট করে ব্যবহার করেছে। অনেক ক্ষেত্রে নিউজ পোর্টালের ম্যানেজার বা সাংবাদিকরা জানেন খবরটি ভুয়া, তারপরও রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ করতে বা মানুষকে ধোঁকা দিতে এটি ব্যবহার করছেন। আগামী নির্বাচনে এই ফেক নিউজ ভয়াবহ পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে, যা তথ্য বিভ্রাট ও নানা শঙ্কা তৈরি করবে।

জাগো নিউজ: সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাদারত্ব রক্ষায় কী বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন?

রাহাত মিনহাজ: নৈতিকতা নিয়ে নিয়মিত কথা হলেও হাতেগোনা কয়েকটি গণমাধ্যম ছাড়া কেউ এটি তোয়াক্কা করে না। আমরা আসলে ভালোর দিকে না গিয়ে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছি। নির্বাচনের সময় বা পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং সাংবাদিকতার এক কদর্য রূপ আমরা দেখতে পারি।

জাগো নিউজ: সাংবাদিকতা শিক্ষার বর্তমান পাঠ্যক্রম কি আধুনিক প্রযুক্তিগত চাহিদা পূরণে যথেষ্ট?

রাহাত মিনহাজ: বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষায় অনেক বড় ঘাটতি রয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন করেন সাংবাদিকতা বিভাগ কী সাংবাদিকতা শেখায়। আসলে বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই সরাসরি ‘পেশাদার সাংবাদিক’ তৈরি করে না; তারা মূলত তত্ত্ব ও যোগাযোগ পড়ায়। পেশাদার সাংবাদিক তৈরির দায়িত্ব বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের। বাংলাদেশে এমন কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও তাদের সংখ্যা অপ্রতুল এবং মানও খুব একটা ভালো নয়। আধুনিক প্রযুক্তির চাহিদা মেটাতে আরও মানসম্মত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানো দরকার।

জাগো নিউজ: নতুন বছরে একজন তরুণ সাংবাদিককে আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

রাহাত মিনহাজ: আমি আবারও বলছি, নতুন বছরে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা রক্তাক্ত হতে পারে। এটি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ও ভীতিকর হবে। তাই সাংবাদিকদের নিজস্ব নিরাপত্তা বা সেফটি-সিকিউরিটির বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংবাদের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। মব ভায়োলেন্স বা দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে কোনোভাবেই নিজের জীবন বিপন্ন করা যাবে না।

জাগো নিউজ: আগামী বছর রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে সাংবাদিকদের সাহায্য করতে পারে?

রাহাত মিনহাজ: বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা দেখেছি বিভিন্ন গণমাধ্যম বর্বরভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা সারা বিশ্বের কাছে একটি কলঙ্কজনক ঘটনা। সাংবাদিক আনিস আলমগীরসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক বর্তমানে কারাগারে। আমি কামনা করব, নতুন বছরে সরকার এসব বিষয় অ্যাড্রেস করবে এবং যারা মিথ্যা মামলায় কারাগারে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে। রাষ্ট্র যেন নিশ্চিত করে যে, নতুন করে কোনো সাংবাদিক আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হবে না।

জাগো নিউজ: ব্যস্ততার মাঝেও জাগো নিউজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রাহাত মিনহাজ: আপনাদের এবং জাগো নিউজের পাঠকদেরও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

এমডিএএ/এমআরএম/এমএমএআর/এমএফএ/জেআইএম