কুয়াশায় মোড়ানো সকালে ভোট দিতে ব্যতিব্যস্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ ২০ বছর পর ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত তারা। ভোটারের লাইনে দাঁড়িয়ে একটাই অনুভূতি প্রকাশ করছেন সবাই, এটা শুধু ভোট নয়, আমাদের অধিকার ফিরে পাওয়ার দিন।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমরা শুধু গল্পে শুনেছি। আজ ভোট দিতে পারছি, এটাই বড় পাওয়া। আশা করি, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হলের সংকট আর একাডেমিক সমস্যাগুলো নিয়ে সোচ্চার হবেন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, শীত উপেক্ষা করে এসেছি, কারণ এই ভোট আমাদের কণ্ঠস্বর। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, নারী শিক্ষার্থীদের সমস্যা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এসব বিষয়ে আমরা বাস্তবে পরিবর্তন দেখতে চাই।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া রহমানের প্রত্যাশা, দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে জকসু যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংসদ হয়। নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেই ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চা শক্ত হবে।
আরও পড়ুন:জকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তানভীর হাসান বলেন, ২০ বছর পর এই নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়। আমরা চাই, জকসু নিয়মিত হোক এবং প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করুক।
এমন আবহেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন-২০২৫। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ২০ বছরের অচলায়তন ভেঙে আজ ১৬ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর এই নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে সেদিন ভোরে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এক জরুরি সিন্ডিকেট সভায় জকসু ও হল সংসদ নির্বাচন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়। দিনভর এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভোটগ্রহণের নতুন তারিখ ৬ জানুয়ারি ঘোষণা করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, ২০০৫ সালে কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পর দীর্ঘ ২০ বছরেও এই ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দেখা মেলেনি। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোরালো দাবির মুখে অবশেষে ক্যাম্পাসে ফিরেছে নির্বাচনি হাওয়া।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান বলেন, নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। তবে ৩টার মধ্যে যারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করবেন, তারা সবাই ভোট দিতে পারবেন।
নির্বাচনের ব্যাপকতা নিশ্চিত করতে জকসু নির্বাচনের জন্য ৩৮টি এবং হল সংসদ নির্বাচনের জন্য ১টি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংসদে ১৬ হাজার ৬৪৫ জন এবং হল সংসদে ১ হাজার ২৪২ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।
প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে যেসব শিক্ষার্থীর আইডি কার্ডের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, তারা নির্বাচন কমিশনের পোর্টাল থেকে কিউআর কোড স্ক্যান করে ডিজিটাল ভোটার কার্ড সংগ্রহ করে ভোট দিতে পারছেন। ক্যাম্পাসের তিনটি বড় ডিজিটাল বোর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নির্বাচনের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে।
প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে ফল ঘোষণা করবেন। পরে সব কেন্দ্রের ফল সমন্বয় করে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করবে কমিশন।
নির্বাচনি সহিংসতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ক্যাম্পাসে তিন স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে এবং প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেও আলাদা সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি কন্ট্রোল রুমও খোলা হয়েছে।
এমডিএএ/এসএনআর/এএসএম