ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশগ্রহণের জন্য প্রবাসীদের পোস্টাল ভোট নিবন্ধনের সময়সীমা শেষ হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাত ১২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিবন্ধন কার্যক্রমের পর্দা নামে।
হাজার মাইল দূরে থেকেও ভোটের টানে এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন প্রবাসীরা। মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে পোস্টাল ভোট নিবন্ধনে দেখা গেছে অভূতপূর্ব সাড়া।
দূর প্রবাসে কঠিন কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত জীবন আর সংগ্রামের বাস্তবতায় দিন কাটালেও বুকের গভীরে বহন করে চলেছেন দেশের টান। সেই টান থেকেই পোস্টাল ভোটের সুযোগকে ঘিরে মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের মাঝে ফিরে আসে নতুন আশার আলো।
দীর্ঘদিন পর দেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ যেন তাদের নাগরিকত্বের পূর্ণতা এনে দিয়েছে। নিবন্ধনের শেষ মুহূর্তে কার্যক্রমকে সহজ ও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। সাধারণ প্রবাসীদের হাতে-কলমে সহায়তা দেন হাইকমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পাশাপাশি মালয়েশিয়া বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন, জামায়াতে ইসলামী মালয়েশিয়া, মালয়েশিয়া বাংলাদেশ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশন (এমবিএফএ), জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন মালয়েশিয়া, বাংলা প্রেসক্লাব মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রমে নিবন্ধন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। এতে অংশ নেন বহু সচেতন প্রবাসী-যা প্রবাসী ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
কুয়ালালামপুর, সেলাঙ্গর, জোহর, পেনাংসহ বিভিন্ন রাজ্যের কর্মস্থল ও শ্রমিক ডরমিটরিতে ছুটে বেড়ান স্বেচ্ছাসেবীরা। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ জোগাড় করে, অনলাইন ফরম পূরণে সহায়তা দিয়ে এবং ভাষাগত জটিলতা বুঝিয়ে প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ান তারা। লক্ষ্য ছিল ৫ জানুয়ারির আগেই যেন কোনো প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন।
সর্বশেষ তথ্যমতে, মালয়েশিয়া থেকে মোট ৮৪ হাজার ১৭৫ জন প্রবাসী বাংলাদেশি সফলভাবে পোস্টাল ব্যালটের জন্য ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
নিবন্ধন কেন্দ্রগুলোতে দেখা যায় আবেগঘন দৃশ্য। কারও চোখে জল, কারও কণ্ঠে কাঁপন। এক প্রবাসী বলেন, বছরের পর বছর ভোট দিতে পারিনি। এবার মনে হচ্ছে আমিও দেশের একজন পূর্ণ নাগরিক। কেউ আবার দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ফাঁকে লাইনে দাঁড়িয়ে নিবন্ধন করেছেন-শুধু এই আশায় যে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অন্তত একটি ভোট দিতে পারবেন।
স্বেচ্ছাসেবকদের ভাষ্য, অনেকের কাছেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া ছিল জটিল। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, অনলাইন ফরম পূরণ এবং নির্ধারিত সময়সীমা-সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল বিভ্রান্তি। তবে সেই বাধা পেরোতে চলেছে নিরলস প্রচেষ্টা। প্রতিদিন শত শত প্রবাসী এই উদ্যোগের আওতায় যুক্ত হয়েছেন।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সাঈদ মাওলা বলেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি বিভিন্ন খাতে কর্মরত হলেও নিবন্ধন নিয়ে তাদের মধ্যে এখনো ভয় ও অনীহা কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সঠিকভাবে সংরক্ষিত বা সহজলভ্য ছিল না।
তবে বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক পটভূমির সচেতন নাগরিকরা এগিয়ে এসে শ্রমিকদের উদ্বুদ্ধ করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। শিল্পকারখানা, পেট্রোল স্টেশন, রেস্টুরেন্ট, রেমিট্যান্স হাউস, মসজিদ, প্ল্যান্টেশন এলাকা ও নির্মাণস্থল-যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি বেশি, সেসব স্থানে গিয়ে নিবন্ধনের গুরুত্ব ও আইনি সুরক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা হয়।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি এবং তাদের বৈধতার আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, যেন তারা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবন পরিচালনা করতে পারেন।
প্রবাসী কমিউনিটির নেতারা মনে করছেন, এটি শুধু ভোটার তালিকায় নাম লেখানোর বিষয় নয়; বরং প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বিচ্ছিন্নতার দেয়াল ভাঙার একটি ঐতিহাসিক সূচনা। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে সবাইকে একত্র করেছে একটি মৌলিক অধিকার-ভোটাধিকার।
বিশেষ করে তরুণ প্রবাসীদের মাঝে দেখা গেছে আলাদা উদ্দীপনা। অনেকেই প্রথমবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের কাছে এটি কেবল ভোট নয়-এটি গর্ব, দায়িত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্ন।
প্রবাসীরা বলছেন, দেশ থেকে দূরে থাকলেও হৃদয় থাকে দেশে। পোস্টাল ভোট সেই হৃদয়ের ভাষা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিবন্ধনের এই প্রচেষ্টা চলে ৫ জানুয়ারি রাত ১০টা পর্যন্ত।
এমআরএম/এএসএম