দখল ও দূষণে ব্যাহত হচ্ছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা সেবার পরিবেশ। অযত্ন ও অবহেলায় ৪০ বছরের পুরোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। পরিবেশ ও সম্পদ রক্ষায় নেই তেমন উদ্যোগ। ফলে এটি এখন অনেকটাই গণশৌচাগার ও আবর্জনার স্তূপে রূপ নিয়েছে। এতে ভোগান্তির শেষ নেই চিকিৎসক ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের। দ্রুতই এই জরাজীর্ণতা কাটিয়ে চিকিৎসা সেবার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তথ্য বলছে, প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার লক্ষ্যে সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে উপজেলার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র কাশিনাথপুর বাজারের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা হয় কাশিনাথপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। শুরুতে চিকিৎসা সেবা ও এর পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও পরে ভবনটি পুরনো ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ওই ভবনে স্বাভাবিক চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরে পাশেই আরেকটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসক ও সরঞ্জাম সংকটে চলছে চিকিৎসা সেবা।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিদিন কাশিনাথপুরসহ প্রায় তিনটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের শতাধিক রোগী এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু চিকিৎসা কেন্দ্রটির পরিবেশ একেবারেই নাজেহাল। গেইট অরক্ষিত থাকায় যত্রতত্র লোকজন প্রবেশ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কম্পাউন্ড দূষিত করছে। মূল সড়ক ও কাশিনাথপুর বাজারের পাশে হওয়ায় ব্যবসায়ী ও পথচারীসহ প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ লোক এখানে এসে প্রাকৃতিক কাজ সারেন। বাজারের সকল ব্যবসায়ীরা তাদের উচ্ছিষ্ট ময়লা আবর্জনা ফেলে। ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ঢুকে চিকিৎসা নেওয়ার আগেই দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও তার স্বজনরা। একই ভোগান্তি চিকিৎসকদেরও।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গা দখল করে হরিজন সম্প্রদায়ের বেশকিছু পরিবার বসতি স্থাপন করায় এর পরিবেশ আরও বেশি নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। দ্রুত দখলদার ও আবর্জনা অপসারণ করাসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে সুরক্ষিত করে সুন্দর চিকিৎসা সেবার পরিবেশ স্থাপনের দাবিও তাদের।
স্থানীয় সংবাদকর্মী আরিফুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে চিকিৎসা দেওয়ার পরিবেশ নেই। গেইট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে অনেকেই দেয়াল ঘেঁষে প্রস্রাব করছেন। আবার ওখানেই বাজারের ব্যবসায়ীদের ফেলা ময়লা আবর্জনার স্তূপ। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি চিকিৎসা কেন্দ্র। মনে হয় এটি যেন একটি ময়লার ভাগাড়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন বলেন, পুরোনো ভবনটি ভূতের বাড়ির মতো পড়ে আছে। গেইট খোলা থাকায় যখন তখন যে কেউ ওখানে ঢোকে। বিভিন্ন সময় মাদক সেবন চলে। এরকম নানাভাবে এখানকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
কাশিনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব আবু সাইদ মাস্টার বলেন, নতুন ভবনে চিকিৎসা চলছে। পুরোনো ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এটিও পরিবেশ নষ্ট করছে। ময়লার স্তূপের সঙ্গে নিলামে এটিও অপসারণ করা উচিত। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কম্পাউন্ডে মাটি ফেলে ও গেইট সুরক্ষিত করাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সুন্দর পরিবেশ ফেরানো জরুরি প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কম্পাউন্ডে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করা হরিজন সম্প্রদায়ের রনি বলেন, কাশিনাথপুর সদর এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের কাজ করা আমরা ৭-৮টি পরিবার প্রায় ৪০-৪৫ বছর ধরে এখানে আছি। যাওয়ার জায়গা নাই। আমরা কোথায় যাবো? তাই এখানেই আমরা বাস করি।
উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. এনামুল হক বলেন, আমি এটির দায়িত্বে থাকলেও চিকিৎসক সংকট থাকায় সম্প্রতি আমাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ওখানে সহকারী মেডিকেল অফিসার ও অন্যান্যদের দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে চিকিৎসার পরিবেশ নেই। এখানে অবৈধভাবে কিছু দখলদার বসতি স্থাপন করায় গেইটে তালা দেওয়া যায় না। বাউন্ডারি ঠিকঠাক নেই। ফলে যে কেউ যখন তখন ঢুকে মল-মূত্র, ময়লা-আবর্জনা ফেলে। রাতে মাদকের আসর বসে। নিচু জায়গা হওয়ায় বাজারের সব ময়লা পানিও এখানে জমে। আলাদা তেমন বরাদ্দ না থাকায় দীর্ঘদিন এসব সমস্যা থাকলেও তা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তবে এর একটি সুরাহা করা প্রয়োজন।
সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল বাতেন বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন মিটিংয়ে আলাপ করেছি। বাউন্ডারি নিচু হওয়ায় অনেকেই সহজেই ময়লাগুলো ফেলে। গেইট খোলা থাকায় যে কেউ প্রবেশ করেন। এক্ষেত্রে বাউন্ডারি উঁচুকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মাটি ভরাটেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আলমগীর হোসাইন নাবিল/এফএ/জেআইএম