মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম
আবদুর রহমান মল্লিক তার সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘সারেঙ’ ২৪তম সংখ্যা (জানুয়ারি-২০২৬) সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রকাশ করেছেন। এ কাজ করে মল্লিক কেবল একজন সন্ত মনীষীর প্রতি সম্মান দেখালেন তা-ই নয়; তিনি নিজেও মহিমান্বিত হলেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক একজন অতন্দ্র-সরব দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমী দার্শনিক ব্যক্তিত্ব। সভ্যতার ধ্রুপদি ধারায় তার সরব উপস্থিতি। ব্যক্তিজীবনের সুখ-সমৃদ্ধি তাকে টানে না। সর্বজনীন কল্যাণে নিঃস্বার্থ নিবেদন করেন তিনি তার সব অর্জন ও সামর্থ। এ পথ তার বন্ধুর জেনেও আরাধ্য থেকে তিনি একটুকুও টলে যান না।
সত্য ও ন্যায়ের নিদারুণ এই আকালের দিনে তিনি একা-একলা। বুদ্ধিজীবীতা ও মনুষ্যত্বের নির্মম পতন তাকে ক্ষুব্ধ ও আহত করে। কিন্তু হতাশ হন না। তিনি লেখেন, কথা বলেন নিরবধি-দ্বিধাহীন চিত্তে, দৃঢ়প্রত্যয় ও দুর্নিবার সাহস নিয়ে। তার লেখায় ও বলায় উচ্চকণ্ঠের আস্ফালন নেই, প্রচারমুখি প্রগলভতা নেই। স্বভাবে নীরব অথচ তাতে বলিষ্ঠতার কমতি নেই। ধর্মসহ দুনিয়ার সব শুভ ও কল্যাণকর চিন্তা তিনি অনায়াসে গ্রহণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। কিন্তু শিকড়বিচ্ছিন্ন চিন্তার যাযাবরত্ব বরণ করা তার একেবারেই অপছন্দ।
তিনি তার আত্মসত্তা ও স্বকীয় ঐতিহ্যের অধীনে থাকেন। মহামতি বুদ্ধ, অতীশ দীপঙ্কর, মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা ও শান্তিবাদী নীতির মর্মের উত্তরাধিকারের ঐতিহ্য সন্তর্পণে বয়ে নিয়ে চলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এই ভূূ-ভাগে সমকালীন চিন্তার জগতে তিনি এক সন্তপুরুষ। এই বিরল দার্শনিক মনীষীকে খুঁজে বের করে আনার আন্তরিক প্রয়াস নিলেন সম্পাদক আবদুর রহমান মল্লিক। সেজন্য তিনি সত্যাগ্রহী সজ্জন জ্ঞানানুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও ভালোবাসায় সিক্ত হবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
২১৬ পৃষ্ঠার কলেবরের সারেঙ সংখ্যাটি দৃষ্টিনন্দন। সুন্দর প্রচ্ছদ, ঝরঝরে ছাপা ও পরিচ্ছন্ন সম্পাদনাশৈলী; এককথায় যাকে বলা যায় একটি স্মার্ট সম্পাদনাকর্ম। যারা লিখেছেন তারা মন-প্রাণ খুলে নিরাসক্ত আবেগ ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় লিখেছেন। বিজ্ঞাপন-আড়ম্বরতা কিংবা শিরঃপীড়া নেই। পাঁচটি বিজ্ঞাপনপত্রের সুনিপুণ আশ্রয়ে আচ্ছন্ন থাকেন না আবুল কাসেম ফজলুল হক। বরং পরম লালিত্যে বাঙ্ময় হয়ে উদ্ভাসিত থাকেন আবুল কাসেম ফজলুল হক স্বমহিমায়।
আরও পড়ুনদেয়াঙ মাছ সংখ্যা: বাঙালির শেকড় অনুসন্ধান আখ্যান: সাহিত্যের নতুন আঙিনা ও কণ্ঠস্বর
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জ্ঞানের জন্য জ্ঞান সাধনা করেন না। বাজারের সস্তা জনপ্রিয়তায় গা-ভাসান না। তার এক জীবনের সাধনার ধ্রুবতারা বাঙালির মুক্তি, মানবজাতির মুক্তি ও শান্তির এক পৃথিবী গড়ে তোলা। আটাশ দফা কর্মসূচি তার চিন্তা ও কাজের সারাৎসার। বাঙালি জাতি ও বিশ্বসভ্যতার চলমান সংকট কাটিয়ে নতুন সভ্যতা গড়ে তোলায় তার সুপারিশমালা আটাশ দফা কর্মসূচি। তার মতে, বিদ্যমান জাতীয় ও বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। জাতিরাষ্ট্র গঠন ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিক বিশ্বসরকার ব্যবস্থায় বিশ্বব্যবস্থার পুর্নগঠন করে সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারায় ন্যায় বাড়িয়ে, অন্যায় কমিয়ে নতুন সভ্যতার গতিমুখের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের মনীষাকে পূর্ণতায় পেতে দিকটির উন্মোচন দাবি রাখে এবং পাশাপাশি রাজনীতি বিষয়ে তার চিন্তার জায়গাটির দিকেও বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকা আবশ্যক বলে মনে করি। তার মতে, রাজনীতি মানবজাতিকে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় শক্তি। সংঘশক্তি ছাড়া প্রগতি অচল। সভ্যতা নিশ্চল। নতুন রাজনীতি, নতুন রাজনৈতিক দল ও নতুন নেতৃত্ব অপরিহার্য। তার জন্য দরকার নতুন ধারার জাগরণ।
সংকলনটিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের ১০টি সাক্ষাৎকার ও কয়েকটি লেখা মুদ্রিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারগুলোয় প্রদত্ত তার মতামত সমকালীন বাংলাদেশের সমাজ-সামাজিকতা, রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে ও করণীয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন; এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সাক্ষাৎকারগুলোর প্রকাশকাল ও মাধ্যম পরিচিতি উল্লেখিত থাকলে পাঠক-গবেষকদের জন্য আরও সুবিধা হতো বলে মনে হয়।
সত্য, সুন্দর ও সর্বজনীন কল্যাণকর কাজের সক্রিয়তা অব্যাহত থাকুক।
লেখক: আহ্বায়ক, বাংলাদেশ জাগরণী শান্তিসঙ্ঘ।
এসইউ