প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা বাংলাদেশের নদীগুলো। নদীর স্বচ্ছ জল, দুপাশের সবুজ তীর আর শান্ত পরিবেশ মানুষের মনে এনে দেয় প্রশান্তি। নদীর ওপর ভোরের সূর্য, দুপুরে ঝলমলে রোদ আর সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের রং—নদীর পরিবেশকে আরও মুগ্ধকর করে দেয়। এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে নদীভ্রমণে ছুটছেন পর্যটকেরা। এককথায় বলা চলে—পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠছে ‘নদীর সৌন্দর্য’।
দেশের পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সেরা পর্যটনকেন্দ্রগুলো এখন পরিবেশ হারাচ্ছে। হোটেল-রিসোর্টে লাগামহীন ভাড়া, লোকজনের অতিরিক্ত ভিড়, খাবারের দামসহ নানা কারণে এখন স্থলের যে কোনো পর্যটনকেন্দ্রে গেলেই বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যার কারণ হচ্ছে ‘অতিরিক্ত পর্যটক’। মনে হবে একেকটি পর্যটনকেন্দ্র যেন নতুন কোনো গুলিস্তান। এতসব পর্যটকের থাকার জায়গা করে দিতেই যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অগণিত অপরিকল্পিত হোটেল ও ইমারত। ফলে পর্যটনকেন্দ্র যেন দিনদিন প্রকৃত প্রাণ হারাচ্ছে।
এমন অবস্থায় নিরিবিলি ও প্রকৃত পরিবেশের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। এ কারণেই পর্যটকেরা বিকল্প হিসেবে খুঁজে নিয়েছেন নদীকে। বড় সব পর্যটকবাহী হাউজ বোটে কিংবা নৌকা-ট্রলার ও লঞ্চে করে মুক্ত পাখির মতো ঘুরে বেড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন শহুরে পর্যটকেরা।
সবুজে ঘেরা শান্ত নদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকেরা। নদীর দুই তীরে ঘন গাছপালা, শান্ত জলধারা ও খোলা আকাশ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের সময় নদীর দৃশ্য পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠছে। নদীকে ঘিরে নৌভ্রমণ, ছবি তোলা ও প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে।
পর্যটকদের মতে, শহরের কোলাহল থেকে দূরে এমন শান্ত পরিবেশ মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। নদীর ধীরে বয়ে চলা জলধারা ও চারপাশের সবুজ প্রকৃতি মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অনুভূতি দেয়। অনেক পর্যটক তাই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে নদীমুখি হচ্ছেন।
ঢাকা থেকে উপকূলীয় জেলা বরগুনার বিষখালী নদী দেখতে এসেছিলেন হাসিবুল্লাহ দোহা। ভ্রমণ নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘পর্যটন স্থান বলতে আমরা যে জায়গাগুলো চিনি, তা দিনদিন যেন ‘মানুষের বাজার’ হিসেবে রূপ নিচ্ছে। অপরদিকে নদীর বুকে স্নিগ্ধ পরিবেশ, নির্মল বাতাস আর কোলাহলহীন সময় কাটানোর সুযোগ অবারিত। তাই ভ্রমণ হিসেবে আমি নদীকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।’
আরও পড়ুনভোলার তারুয়া সমুদ্রসৈকতে যেভাবে যাবেন পানগুছির পাড়ে এক মনোরম সন্ধ্যা
কেউ কেউ মনে করেন, ব্যস্ত জীবনের চাপ ও ক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে নদীভিত্তিক পরিবেশ অত্যন্ত কার্যকর। ছবি তোলা ও প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগের পাশাপাশি নদী তাদের জন্য এক ধরনের মানসিক বিশ্রামের স্থান হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে সম্পূর্ণা ভ্রমণতরীর স্বত্বাধিকারী আরিফুল আলম বলেন, ‘ইট-কাঠের শহর থেকে বেরিয়ে একটু নিরিবিলি ও উপভোগ্য সময় কাটাতেই মানুষ ভ্রমণ করে। কিন্তু দেশের নামকরা সব ভ্রমণ কেন্দ্রগুলোতেও উপচে পড়া ভিড়ের কারণে ‘উপভোগ্য’ পরিবেশ মেলা কঠিন। অপরদিকে হাওরগুলোতেও এখন পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। এরই বিকল্প হিসেবে উপকূলীয় নদ-নদী ও চরের দিকে ছুটছেন পর্যটকেরা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যারা পর্যটন সংশ্লিষ্ট সেবা দিই; তারা নদী ভ্রমণে এখন পর্যটকদের ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। এ ছাড়া ভ্রমণ শেষে পর্যটকদের মতামত চেয়ে যখন প্রশ্ন করি; অধিকাংশ পর্যটকই নদী ভ্রমণকে বেশি পছন্দ করেছেন।’
পাশাপাশি স্থানীয় পর্যটন শিল্পের বিকাশও ঘটছে নদীকে ঘিরে। এলাকার অর্থনীতিও চাঙা হচ্ছে। একাধিক নদী তীরবর্তী জনপদে কথা বলে জানা গেছে, নদীকে কেন্দ্র করে নৌভ্রমণে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে। স্থানীয় বাজার ও দোকানগুলোয় এর প্রভাব পড়ছে। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন।
পর্যটন বিশ্লেষকরা মনে করেন, নদীর প্রকৃতিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি সরকারি আয়ের অন্যতম খাত হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং পর্যটকদের সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে নদীর স্বাভাবিক সৌন্দর্যও অটুট থাকবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
তবে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশ দূষণ এই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি নদীর সৌন্দর্য ধরে রাখতে পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন স্থানীয়রাও।
এসইউ