মতামত

মূল্যস্ফীতির চাপে সংসার

দেশের রাজনীতিতে এখন জোট, পাল্টা জোট আর ভোটের নানা হিসাব–নিকাশ চলছে। টেলিভিশনে, পত্রিকায় এসব নিয়ে আলোচনা কম নেই। কিন্তু এসব রাজনীতির চমকের মাঝেও সাধারণ মানুষের মুখে হাসি নেই। মানুষের মনে স্বস্তি নেই। কারণ, রাজনীতি যতই বদলাক, তাদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট কমছে না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো কিছুটা ভালো হবে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমবে, আয় বাড়বে, রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা ফিরবে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আশাগুলো ভেঙে গেছে। যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তা এখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় রূপ নিয়েছে।

সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ রাজনীতির বড় বড় শব্দ বোঝে না। রাষ্ট্রসংস্কার, আধিপত্যবাদ, স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকানো, নতুন বন্দোবস্ত—এই কথাগুলো তাদের কাছে দুর্বোধ্য। তারা এসব নিয়ে খুব একটা চিন্তাও করে না। কারণ তাদের চিন্তা খুব সোজা, আজ ঘরে চাল আছে কি না, কাল বাজারে গেলে ডাল কিনতে পারবে কি না, সন্ধ্যায় ছেলে-মেয়ে নিরাপদে বাসায় ফিরবে কি না।

একজন রিকশাচালক বা গার্মেন্টসকর্মীর কাছে রাজনীতি মানে হলো: দিন শেষে পেটে ভাত জুটল কি না। একজন গৃহিণীর কাছে রাজনীতি মানে: মাসের শেষ দশ দিনে রান্নাঘরে কীভাবে হিসাব মিলবে। একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর কাছে রাজনীতি মানে: বাড়িভাড়া, স্কুল ফি আর বাজার খরচ একসঙ্গে কীভাবে সামলানো যাবে।

এই জায়গায় অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের ন্যূনতম নিরাপত্তাও তারা নিশ্চিত করতে পারেনি। হত্যা, খুন, মব-সন্ত্রাস, ছিনতাই, চুরি, অনিশ্চয়তা—এসব নিয়ে মানুষের ভয় কাটেনি। রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর যে ন্যূনতম অধিকার, সেটুকুও অনেক মানুষ পাচ্ছে না।

এর চেয়েও বড় ব্যর্থতা হলো, মানুষের পেটে খাবার জোটানোর প্রশ্নে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমেনি। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস—সবকিছুর দামই আগের মতো চড়া। বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয় বাড়েনি। যাঁরা আগে ৩০ হাজার টাকায় কোনোমতে মাস চালাতেন, এখন তাঁদের ৪০ হাজার টাকা হলেও সংসার চলে না। টাকার দাম কমে যাওয়ার বিষয়টি মানুষ খুব সহজভাবে টের পাচ্ছে। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় তিন–চার দিনের বেশি চলে না। আগে এক কেজি মাছ কিনলে দু-তিন দিন রান্না করা যেত, এখন আধা কেজিতেই হিসাব কষতে হয়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সপ্তাহে একদিন মাছ, একদিন মাংসের হিসাব করছে। কেউ কেউ সেটাও বাদ দিচ্ছে।

এই অবস্থায় সরকার যখন বড় বড় সংস্কারের কথা বলে, সাধারণ মানুষের কাছে তা অনেক সময় প্রহসনের মতো শোনায়। কারণ, খালি পেটে সংস্কারের গল্প মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে না। সন্তানের স্কুল ফি দিতে না পারা বাবা-মায়ের কাছে রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন বন্দোবস্ত কোনো স্বস্তির খবর নয়। বাজারে গিয়ে দাম দেখে যাঁদের মাথা ঘুরে যায়, তাঁদের কাছে নীতিগত পরিবর্তনের কথা অর্থহীন লাগে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি টানা তিন মাস ধরে বাড়ছে—যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক, কারণ খাদ্যই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে। গত এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি কখনো কমছে, কখনো বাড়ছে—কিন্তু ৮ শতাংশের নিচে নামতে পারছে না। এটি এক ধরনের ‘স্টিকি ইনফ্লেশন’ বা আটকে থাকা মূল্যস্ফীতির লক্ষণ। তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান থাকায় বাজারে দাম বাড়াকে মানুষ এখন আর ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছে না; বরং এটি যেন নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।

ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি একটি সংখ্যামাত্র নয়; এটি লাখো পরিবারের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই নয়, সামাজিক আস্থাকেও দুর্বল করবে। রাষ্ট্রের জন্য এটি এখন নীতির পরীক্ষা—এই চাপ সামাল দিতে না পারলে সরকারের সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়বে। মানুষ রাজনীতির নাটক নয়, চায় পেটের ভাত। চায় নিরাপত্তা আর একটু স্বস্তির জীবন। এই সহজ চাওয়াগুলো পূরণ না হলে যত বড় জোটই হোক, যত বড় পরিকল্পনাই থাকুক—সাধারণ মানুষের কাছে তা মূল্যহীনই থেকে যাবে।

২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ বছরজুড়েই সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থে আয় কমার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কারণ মূল্যস্ফীতি যখন দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, তখন তা শুধু ভোগ ব্যয় কমায় না, সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে বাধ্য করে, ঋণ বাড়ায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্যের দাম বাড়া সবচেয়ে বড় আঘাত হলেও মধ্যবিত্তের জন্য খাদ্যবহির্ভূত খরচই এখন বড় বোঝা। সন্তানের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, যাতায়াত খরচ মেটাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে সামাজিক কাঠামোতে এক ধরনের ‘নীরব সংকট’ তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

বিবিএসের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘নেগেটিভ রিয়েল ওয়েজ গ্রোথ’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কার্যত এক ধরনের অঘোষিত করের মতো কাজ করছে। সরকার কোনো কর না বাড়ালেও বাজারের দাম বাড়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট—সরকারি কর্মচারী, বেসরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী বা দিনমজুর—তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বড় শত্রু।

বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, এক বছর আগে কোনো পরিবার যদি মাসে ১ লাখ টাকা খরচ করে সংসার চালাত, তাহলে এখন একই জীবনযাত্রা বজায় রাখতে তাদের প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ৪৯০ টাকা প্রয়োজন। এই হিসাব জাতীয় গড়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাস্তবে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র। এই অতিরিক্ত ৮ হাজার টাকার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারগুলো কী করছে? কেউ সঞ্চয় ভাঙছে, কেউ ধার করছে, কেউ আবার পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব সিদ্ধান্ত মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামের অস্থিরতা একটি বড় কারণ হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও কম দায়ী নয়। সরবরাহব্যবস্থার অকার্যকারিতা, পরিবহন ব্যয়, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য—সব মিলিয়ে দাম কমার সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিনিময় হার চাপ, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি এবং রাজস্ব ঘাটতির চাপ মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমানোর চেষ্টা করা হলেও তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিল। সুদের হার বাড়ানো হয়েছে, নিত্যপণ্যে শুল্ক ও কর কমানো হয়েছে, আমদানি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দিলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এখনও অধরা।

সমস্যা হলো, মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির বিষয় নয়; এটি রাজস্বনীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বিত ফলাফল। কেবল সুদের হার বাড়ালে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে—যা আবার ভিন্ন সংকট তৈরি করে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাজিক বৈষম্যও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যাদের আয় বেশি, তারা দাম বাড়লেও মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধি জীবনমানের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। ফলে ধীরে ধীরে একটি ‘নতুন দরিদ্র শ্রেণি’ তৈরি হচ্ছে—যারা আগে মধ্যবিত্ত ছিল, এখন ব্যয় মেটাতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এই শ্রেণির সংকট নীতিনির্ধারণে প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও বাজারে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে, যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা উপকৃত হয়। তৃতীয়ত, মজুরি ও আয়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় ঘটাতে নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলাকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক সংকট হিসেবেও দেখা। কারণ দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনমান, সামাজিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি একটি সংখ্যামাত্র নয়; এটি লাখো পরিবারের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই নয়, সামাজিক আস্থাকেও দুর্বল করবে। রাষ্ট্রের জন্য এটি এখন নীতির পরীক্ষা—এই চাপ সামাল দিতে না পারলে সরকারের সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়বে। মানুষ রাজনীতির নাটক নয়, চায় পেটের ভাত। চায় নিরাপত্তা আর একটু স্বস্তির জীবন। এই সহজ চাওয়াগুলো পূরণ না হলে যত বড় জোটই হোক, যত বড় পরিকল্পনাই থাকুক—সাধারণ মানুষের কাছে তা মূল্যহীনই থেকে যাবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস