সাহিত্য

মানরো ঘরানা: বিশ্বসাহিত্যে অনন্য দৃষ্টান্ত

হাসান জাহিদ

নোবেলবিজয়ী কানাডীয় লেখক অ্যালিস মানরো বিশ্বপাঠকের কাছে ভিন্ন আদলের ছোটগল্পকার। মূলত তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের ওপর তিনি নোবেল জয় করলেও প্রকৃত অর্থে তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে ছোটগল্পকার হিসেবেই–আর এই ধারায় মানরোই একজন যিনি ছোটগল্প লিখে তাতে উপন্যাসের ব্যাপ্তি এনেছেন।

অনেকের মতে, গল্পের মৌলিক কোনো পরিবর্তন, সংযোজন বা নতুন কোনো অবদান যদি কারো থেকে থাকে তবে তা হোর্হে লুই বোর্হেসের। অ্যালিস মানরোর গল্প তো প্রথাগত, যে গল্প আমরা পড়ে আসছি, অনেকটা সেরকমেরই। তবে তাতে ভিন্নতা আছে, এই ভিন্নতাকে বুঝতে ও তাকে পাঠ করার ক্ষেত্রে কতগুলো প্যারামিটার মনে রাখতে হবে: তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা একটি দেশ কানাডা—সে দেশের মানুষজন আসলে কী রকম জীবনযাপন করে। যদি তারা প্রান্তিক মানুষ হন তাহলে কী রকম জীবনযাপন করতেন। অতীতে, প্রাচীনকালে তারা কেমন জীবনযাপন করতেন।

শুরুতেই দুটি বিষয় পাঠককে জানাতে চাই, মানরো আলাদা এবং জটিল মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচনে কেন তিনি পারদর্শী আর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বারবার কেন তার গল্পে ঘুরপাক খায়। এক, তিনি ঐতিহ্য ও শেকড়ের ধারক ও বাহক। দুই, তিনি ছোটগল্পে এনেছেন উপন্যাসের ব্যাপ্তি।

মানরোকে বুঝতে হলে তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও পরিণত বয়স ও তার জন্মস্থান কানাডার অন্টারিও প্রদেশকে বিশেষভাবে বুঝতে হবে। পৃথিবীতে শুধু ছোটগল্প লিখে বিশ্বসাহিত্যে বা বিশ্বপাঠকের কাছে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তি হাতেগোনা; বলতে গেলে নেই। অ্যালিস মানরো তেমন একজন।

অ্যালিস অ্যান মানরো একজন কানাডীয় ছোটগল্প লেখক; যিনি ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। মানরোর ছোটগল্পগুলো গ্রামীণ কানাডার বাসিন্দাদের সংবেদনশীল জীবনকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণনরত। তার গল্পগুলো, প্রায়শই দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিওতে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়, যেখানে তিনি তার শৈশব কাটিয়েছিলেন, সাধারণত কোনো যুবক বা কিশোরী মেয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয় এবং বিশেষত নারীদের আগ্রহের বিষয়গুলোকে উপজীব্য করা হয়।

‌‘হাউ আই মেট মাই হাজব্যান্ড’ গল্পটি ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর প্রথম পুরুষের আখ্যানে উন্মোচিত হয়েছে। সে খুব উজ্জ্বল কিশোরী নয়, আবার কোনো দোকানে নিশ্চল ও বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানিকিন নয়। সে মানবী এবং অনুভূতিসম্পন্ন। তাই তার বয়সের সাথে মানানসই সমস্ত অনুভূতি, আবেগ এবং কল্পনা রয়েছে।

শিক্ষায় তার প্রতিভা দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার পর, তার মায়ের সাথে তাকে দেশের একটি পশুচিকিৎসক দম্পতির জন্য কাজ করতে পাঠানো হয়; যেখানে তার সাথে এমন একজন পাইলটের দেখা হয়, যিনি শখের বশে বিমান উড়ান। আগ্রহী লোকদের সংক্ষিপ্ত উড়ানোর মাধ্যমে টাকা উপার্জন করেন তিনি। মেয়েটি তার দ্বিগুণ বয়সী এই পুরুষের প্রতি একটি রোমান্টিক আপেক্ষিকতা তৈরি করে এবং তার ক্যাম্পে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের সময় একদা পাইলট তাকে বিছানায় নিয়ে যায়, কিন্তু কয়েক মিনিটের জন্য কেবল তাকে চুম্বন করে।

মেয়েটা এটাকে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মনে করে। এই ঘটনার দিন পাইলট মেয়েটিকে জানায় যে, পেশাগত কারণে তিনি একই দিনের বিকেলে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন, কিন্তু তিনি তাকে খুব পছন্দ করেন এবং যেখানেই যান না কেন তিনি মেয়েটিকে চিঠি লিখবেন এবং একদিন তারা আবার দেখা করবেন।

মেয়েটি তার প্রতি তার অন্তরের গভীর বিশ্বাস রাখে এবং পরের সপ্তাহ থেকে সে নির্দিষ্ট সময়ে পোস্টবাক্সের কাছে বসে থাকে, দেখার জন্য যে কোনো চিঠি এলো কি না। প্রতিদিন ডাকপিয়নের সাথে দেখা হলেও চিঠিটি কখনো পৌঁছায় না। তারপর একদিন বাস্তবতা তার কাছে প্রকাশ করে, ‘এটা আমার মনে অনেক দিন ধরে আসেনি যে চিঠিটি হয়তো আসবেই না। আমি বিশ্বাস করেছিলাম যে এটি ঠিক যেমন আমি বিশ্বাস করতাম যে সকালে সূর্য উঠবে।’

...একদিন হাঁটতে হাঁটতে, মেলার মাঠের মধ্য দিয়ে শরতের পূর্ণাঙ্গ মিল্কউইড এবং অন্ধকার টিজেলগুলো দেখতে দেখতে, মেয়েটির মনে হলো: কোনো চিঠি কখনো আসবে না…। মানরোর লেখাগুলো তার শক্তিশালী আঞ্চলিক স্পটলাইটের ফলাফল, কারণ তিনি শেয়ালদের আবাস এবং হাঁস-মুরগির খামারিদের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ছোট শহরের পরিবেশে তার গল্প বর্ণনা করার ফলে তিনি চারপাশের মানুষ ও বস্তুসমূহকে অপরিচিত এবং অপ্রচলিতভাবে দেখেন।

দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিওর ছোট শহরগুলোতে মানরো প্রায়ই স্থান আর দুর্দান্ত উদ্দীপনা, তার শৈলী এবং স্বাভাবিকতা, সময় এবং স্থানজুড়ে বিস্তৃত গল্পগুলোতে তার চরিত্রগুলোর আবেগঘন জীবনকে প্রকাশ করার, পরিবর্তনের ক্ষমতার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। মানরো তার গল্পকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যান, যেখানে তিনি বর্ণনা করেন যে, কীভাবে একদিন ডাকপিয়ন মেয়েটিকে তার সাথে বাইরে যেতে বলে এবং দুইবছর ডেটিং করার পর তারা বিয়ে করে আর তাদের সন্তান হয়।

শেষের লাইনগুলো এরকম: সে (মেয়েটির পোস্টম্যান স্বামী) সব সময় তাদের বাচ্চাদের গল্পটা বলে যে, তাদের মা প্রতিদিন ডাকবাক্সের পাশে বসে তার পেছনে যেত চিঠি এলো কি না জানতে এবং স্বাভাবিকভাবেই, পোস্টম্যানকে হাসাতো এবং নিজেও হাসতো, কারণ সে লোকেদের হাসি পছন্দ করতো, তাদের ভাবতে দিতো, যা তারা ভেবে আনন্দ পেতো।

গল্প বলার কী অনন্য পদ্ধতি! মানরো মূলত তার ছোটগল্পের জন্য পরিচিত। অনেক সমালোচক স্বীকার করেছেন যে মানরোর গল্পগুলোতে প্রায়ই উপন্যাসের আবেগ এবং সাহিত্যিক গভীরতা থাকে। মানরো ছোটগল্প লেখেন কি না প্রায়ই সে প্রশ্ন উড়তো। ইক্লেকটিকায় লেখা অ্যালেক্স কিগানের একটি সহজ উত্তর আছে: ‘হু কেয়ারস?’

‘মানরোর গল্পে অনেক উপন্যাসের মতোই অনেক কিছু আছে।’ মন্তব্যটি বিভিন্নভাবে সম্পূর্ণরূপে ন্যায্য। তার ‘দি প্রোগ্রেস অব লাভ’র এগারোটি গল্পে একটি ন্যায্য আকারের উপন্যাসের জন্য যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। নৈমিত্তিক বাকবিতণ্ডার মাধ্যমে: ‘কোনো চিঠি কখনও আসবে না, গল্পটি এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে যা কখনও ঘটবে না’–এরকম বেশ কয়েকজন লেখক করেছেন। সমারসেট মম তার বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘অব হিউম্যান বন্ডেজ’-এ লিখেছেন যে, দশবছর বয়সী এক ছেলে তার সহপাঠীদের দ্বারা তার (ক্লাব ফুট) বা বাঁকানো পায়ের জন্য অপমানের শিকার হয় এবং কীভাবে সে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাসের এক পর্বের মধ্য দিয়ে যায়।

অ্যালিস মানরো ২০০৯ সালে ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের জন্য নয় বরং তার জীবনকালের কাজের জন্য। আমি ‘দি প্রোগ্রেস অব লাভ’ পড়েছিলাম। পরে আমি ‘সামথিং আই হ্যাভ বিন মিনিং টু টেল ইউ’ পড়তে পেরেছিলাম। কিন্তু আমি তার ‘দি প্রোগ্রেস অব লাভ’ বইটিতে বিশেষ আগ্রহী ছিলাম। কারণ এটি ১৯৮৬ সালে কানাডার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার গভর্নর জেনারেল পুরস্কার জিতেছিল। আমি বইটির প্রায় সবগুলো গল্পই বাংলায় অনুবাদ করেছি। সেসবের দুয়েকটি প্রকাশও করেছি অনলাইন পত্রিকায়।

দেশ-বিদেশের অনেক সমালোচক মানরোকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন কিন্তু তার সম্পর্কে আমার যা সবচেয়ে বেশি পছন্দ; তা হলো উপন্যাসের বিশালতা নিয়ে গল্প বলার অনন্য পদ্ধতি। ইকোনোমিক শব্দের মাধ্যমে, গল্পকে ইতিহাসে রূপান্তরিত করার সহজাত কৌশল ছিল মানরোর। অ্যালিস মানরোর ম্যান বুকার পুরস্কারপ্রাপ্তি বিশ্বের পাঠকদের কানাডার সাহিত্য সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে আর তার অবস্থানকে করেছিল সুদৃঢ়। নিজ দেশ কানাডা এবং প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রে খানিকটা পরিচিতি পেলেও বহির্বিশ্বে তেমন পরিচিত ছিলেন না তিনি ২০০৯ সালে ম্যান বুকার প্রাপ্তির আগে পর্যন্ত।

মানরোর গল্প বিবেচিত হলো কেন বড় পুরস্কারের জন্য? ঠিক কী কারণে তাকে এই পুরস্কারে সম্মানিত করা হলো? একটু গভীরভাবে ভাবলে বেরিয়ে আসবে যে, আসলে মানরোর সামগ্রিক সাহিত্যকর্মকে সম্মানিত করা হয়েছে এই পুরস্কারের মাধ্যমে। আর মানরোর সাহিত্যকর্ম বলতে আমরা বুঝি উপন্যাসের ক্যানভাস নিয়ে তৈরি হওয়া মানরোর ছোটগল্পগুলোকে। আরেকটি জোরালো কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ দক্ষিণাঞ্চলীয় লেখক উইলিয়াম ফকনার কিংবা ফ্ল্যানারি ও’কনরের মতো মানরোর গল্পের চরিত্রেরা ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত নিয়ম-নীতি ও আচার-আচরণের মুখোমুখি হয়। মানরোর ছোটগল্পগুলোকে ‘শর্ট ফিকশন’ বলা হচ্ছে সঙ্গত কারণেই। কারণ তার গল্পগুলো থিম ও বর্ণনায় উপন্যাসের সমকক্ষ অথচ পরিধিতে বড় গল্পের চেয়ে বড় নয়।

ঠিক নারীবাদী লেখিকা বলতে যা বোঝায়, অ্যালিস মানরো তেমন কোনো অভিধা না পেলেও, তিনি একজন লেখিকা বলেই সম্ভবত মেয়েরাই তার প্রায় সব গল্পের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে। দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিওর মফস্বল-শহুরে অঞ্চলে জীবনযাপনের যে সমস্যা, একটি মেয়ের নানান ঘাতপ্রতিঘাতের মুখোমুখি হওয়া, জীবন নিয়ে এগিয়ে চলা–এ সবই তার লেখার মূল উপজীব্য, বিশেষ করে তার প্রথমদিকের গল্পগুলোতে। তার মেয়ে চরিত্রগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ জটিল এবং আধুনিক; যদিও গ্রামীণ এক ধরনের সহজবোধ্যতা যেন তাদের পরিচিতির বিশেষ ছাপ। তার আগের দিকের গল্পগ্রন্থ বিশেষত ‘দি প্রোগ্রেস অব লাভ’ সে স্বাক্ষর বহন করে। প্রধানত শর্ট ফিকশন বা বড় গল্পের পরিধিতে উপন্যাসের স্বাদ দেবার কারিগর হিসেবে মানরোকেই আমরা ‍বুঝি। তার ষষ্ঠ গল্পগ্রন্থ ‘ফ্রেন্ড অব মাই ইয়ূথ’ সে স্বাক্ষর বহন করছে।

জন্মস্থানের (দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অন্টারিও) স্মৃতিচারণে মুন্সিয়ানা প্রদর্শন, অভিজাত ও প্রকৃতিপ্রদত্ত স্টাইল আর চরিত্রগুলোর মসৃণ বর্ণনা, তাদের আবেগের আকস্মিক পরিবর্তন ইত্যকার বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ মানরোভীয় ঘরানা দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। মানরোর এসব বৈশিষ্ট্য ছোটকাল থেকেই লেখক হবার বাসনা থেকে উৎকলিত। এক জায়গায় তিনি বলেছেন যে, নয় বছর বয়স থেকে একজন লেখিকা হওয়া ছাড়া অন্য কিছু হতে চাননি তিনি। মজার বিষয় হচ্ছে–নয় বছর বয়স হবার আগে পর্যন্ত তিনি সিনেমার নায়িকা হতে চেয়েছিলেন।

তিনি তার গল্পে দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিও এলাকা, তথা স্কটিশ-আইরিশ বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগাথা বর্ণনা করেছেন। মানরোর লেখাগুলোয় উপমার ব্যবহার ও বর্ণনাত্মক ভঙ্গিমায় স্তবকাকারে ছন্দোবদ্ধ। তার গল্পে অর্থনৈতিক দিক ও জীবনবোধ প্রগাঢ়তা লাভ করেছে; পাশাপাশি সাধারণ মানুষের গভীর ও জটিল মনোগত দিক প্রকাশ পেয়েছে।

সমালোচকেরা মানরোর গল্পকে ঠিক কী বলবেন–বড় গল্প নাকি শর্ট ফিকশন, না উপন্যাসিকা, সেদিকটা নির্ধারণ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো যে, মানরোর গল্পগুলোর বেশিরভাগই দক্ষিণ পশ্চিম অন্টারিও প্রদেশের ভাবধারায় আবর্তিত, যা গল্পে ফুটিয়ে তুলতে গেলে হয়তো বা উপন্যাসের বিস্তার এসে যেতে পারে কিন্তু মানরো উপন্যাস লিখতে চাননি। তার ঘটনা ও চরিত্র এত অসংখ্য যে, তিনি একের পর এক গল্প রচনা করে গেছেন তার মনের মাধুরি মিশিয়ে। তাই মানরোর গল্পগুলো বড় গল্প, অথচ উপন্যাসের মতো প্রশস্ত নয়। কিন্তু কী দারুণভাবেই না ভাবগাম্ভীর্যে ও বর্ণনায় প্রশস্ত! প্রায় সব ক’টি গল্পেই একটা বিস্তার রয়েছে, যেখানে স্বল্প ভাষায় এবং আকারে ইঙ্গিতে কয়েক পুরুষের চিত্র আঁকা হয়ে যায়।

‘দি প্রোগ্রেস অব লাভ’র প্রথম গল্পের শুরুটা সাদাসিধেভাবে। গ্রামীণ পারিবারিক জীবন। হতাশা, বেদনা আর আশায় ভরা। গল্পটার গুরুত্ব কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গিতে যাচাই করা দুঃসাধ্য। মায়ের আত্মহত্যা করার প্রবণতা এক মেয়ে দেখছে প্রবল হতাশার কারণ হিসেবে। আবার একই গল্পে মেয়ে মায়ের আত্মহত্যা-প্রবণতাকে দেখছে তার বাবাকে ভীত করার এক ধরনের প্রচেষ্টা রূপে। নিউইয়র্ক টাইমসে (সেপ্টেম্বর ১৯৮৬) মিচিকো কাকুতানি গল্পটিকে ‘utter subjectivity of truth’ রূপে বর্ণনা করেছেন। মানরোর আরও গল্পের মতো দি প্রোগ্রেস অব লাভ গল্পটিতেও বর্তমান যেমন আবর্তিত; তেমনই অতীতটাও উঠে এসেছে উত্তম পুরুষের বিবরণে। মানরো এখানে বিধৃত করেছেন তিন প্রজন্মের মা ও মেয়ের কাহিনি। মানরো এই গল্পে অনেকটা যেন নারীবাদী।

বইয়ের দ্বিতীয় গল্পটির নাম লাইকেন (Lichen) বা ছত্রাক। এই গল্পে দেখা যায়, ডেভিড ও ক্যাথেরিন প্রেমিক-প্রেমিকা। তারা বেড়াতে এসেছে লেকের পাড়ে স্টেলা নামের এক নারীর সামারহাউজে। স্টেলা এখানে একা বসবাস করে। স্টেলার বাবা বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। তিনি এখন থাকেন একটা নার্সিংহোমে। মজার বিষয় হলো, ডেভিড প্রেমিকাকে সাথে করে বেড়াতে এসেছে প্রাক্তন স্ত্রী স্টেলার বাড়িতে। অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক গল্প এটি। শহুরে ডেভিডের বিপন্নতাবোধ আর ক্যাথেরিনের টানাপোড়েন নিয়ে। ক্যাথেরিন বুঝতে পারে ডেভিড হয়তো তাকে ভালোবাসে না। আর ডেভিড তো অন্য একটা মেয়ের বাজে ছবি স্টেলাকে দেখিয়ে বলেই ফেলল, ‘আমার নতুন বালিকা।’ স্টেলা ছবিটা দেখে মন্তব্য করল–ছত্রাক। মানরো এখানে গল্পের অন্যতম চরিত্র স্টেলার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিয়েছেন লাইকেন (ছত্রাক) শব্দটি। গল্পটিতে ডেভিড ঘুরে বেড়ায় এক লাইকেন থেকে অন্য লাইকেনের সন্ধানে।

কানাডার গর্ব অ্যালিস অ্যান মানরো (Alice Ann Munro) ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই অন্টারিও প্রদেশের উইংহ্যামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৯২ বছর বয়সে মারা যান ২০২৪ সালের ১৪ মে অন্টারিওর পোর্ট হোপে নিজ বাড়িতে। কানাডার সংবাদপত্র দি গ্লোব অ্যান্ড মেইলের বরাতে জানা যায়, মানরো প্রায় একদশক ধরে ডিমেনশিয়ায় (স্মৃতিভ্রষ্ট রোগ) ভুগছিলেন। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বচ্ছতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কথা নিজের লেখনীতে তুলে ধরায় খ্যাতি আছে মানরোর।

তার ছোটগল্পে যে অর্ন্তদৃষ্টি ও সহমর্মিতা ফুটে উঠত, সে কারণে প্রায়ই তাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত রুশ লেখক আন্তন চেখভের সঙ্গে তুলনা করা হতো। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণার সময় সুইডিশ একাডেমিও বিষয়টি উল্লেখ করেছিল। মানরোর প্রথম বড় সাফল্য আসে ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত ‘ড্যান্স অব দ্যা হ্যাপি শেডস’র হাতধরে। এটি পশ্চিম অন্টারিওর শহরতলির জীবন সম্পর্কে লেখা তার ছোটগল্প সংকলন, যা কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা ‘গভর্নর জেনারেল’ অ্যাওয়ার্ড জিতেছিল। মানরো তেরোটি গল্প সংকলন, ‘লাইভস অব গার্লস অ্যান্ড উইমেন’ নামের একটি উপন্যাস এবং নির্বাচিত গল্পের দুটি খণ্ড প্রকাশ করে গেছেন।

১৯৭৭ সালে দি নিউইয়র্কার ম্যাগাজিন ‘রয়্যাল বিটিংস’ নামের মানরোর একটি গল্প প্রকাশ করেছিল। ছোটবেলায় তার বাবার তাকে দেওয়া বিভিন্ন শাস্তির ওপর ভিত্তি করে বইটি লেখা। এরপর থেকে দীর্ঘদিন এই প্রকাশনার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তার একটি বিখ্যাত গল্প ‘দি বিয়ার কেম ওভার দ্য মাউন্টেন’ নিয়ে ২০০৬ সালে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। এতে জুলি ক্রিস্টি ও গর্ডন পিনসেন্ট অভিনয় করেছিলেন।

মানরো সর্বদাই একটা চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে এগিয়েছেন। কীভাবে চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবেন, কেমন করে ফুটিয়ে তুলবেন তাদের পরম আর ভেতরের সাধারণত্বকে, একই সাথে কেমন করে তাদের মধ্যে একটা অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত রাখবেন, সেসব।

লেখক: কথাশিল্পী, সংগীতশিল্পী ও পরিবেশবিদ।

আরও পড়ুনবশির আহমেদ: সংগীতের এক কিংবদন্তি নাম হ‌ুমায়ূন আহমেদ: সময়ের প্রতিচ্ছবি 

এসইউ