মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
বই শুধু কাগজের বাঁধাই নয়; এটি মানুষের জ্ঞান, অনুভূতি ও সংস্কৃতির অমূল্য ভান্ডার। অনেকেই ঘরে বুক শেলফে প্রিয় বইগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রাখেন। কিন্তু যত্নের অভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই বইয়ের রং ফিকে হয়ে যায়, পাতায় ফাঙ্গাস ধরে, পোকা খেয়ে ফেলে বা বাঁধাই আলগা হয়ে যায়। অথচ সামান্য সচেতনতা বইকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণ করতে পারে।
নিচে বইয়ের যত্নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হলো:
শুকনো ও বাতাস চলাচলযোগ্য জায়গাবই কখনোই আর্দ্র পরিবেশে রাখা উচিত নয়। ভেজা দেওয়াল বা স্যাঁতসেঁতে ঘরে রাখলে পাতায় ফাঙ্গাস জন্মায় ও দুর্গন্ধ হয়। তাই বুক শেলফ সব সময় শুকনো ঘরে রাখতে হবে; যেখানে বাতাস চলাচল ভালো হয়। ভুলেও জানালার কাছে শেলফ রাখবেন না। কারণ শুধু ঝড়-বৃষ্টিতেই বই নষ্ট হয় না। গরম বা ঠান্ডা বাতাসেও বই নষ্ট হয়।
নিয়মিত পরিষ্কার রাখাবইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ধুলো। সপ্তাহে অন্তত একদিন নরম কাপড় বা ব্রাশ দিয়ে শেলফ ও বই পরিষ্কার করতে হবে। চাইলে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারও ব্যবহার করা যেতে পারে। টাকা গোনার মতো করে বইয়ের পাতা ওল্টানোর সময় কখনো আঙুলে থুতু লাগাবেন না। এটা যেমন আপনার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়; তেমনই বইয়ের জন্যও ভালো নয়। খাবার আগে যেমন হাত ধুয়ে নিতে হয়; তেমনই বই পড়ার আগেও হাত পরিষ্কার করে নেবেন। বই ও মন দুটাই ভালো থাকবে।
সঠিকভাবে সাজানোবই কখনোই খুব গাদাগাদি করে সাজানো যাবে না, এতে বই বের করার সময় মলাট ছিঁড়ে যেতে পারে। আবার বেশি ফাঁকা রাখলেও বই বাঁকা হয়ে যায়। তাই বই এমনভাবে সাজাতে হবে যেন দাঁড়িয়ে থাকে সোজা হয়ে এবং সহজে বের করা যায়।
সরাসরি মেঝে বা দেওয়ালের গায়ে নয়শেলফ যদি সরাসরি মেঝেতে বা দেওয়ালের গায়ে রাখা হয়, তবে আর্দ্রতা বইয়ে চলে আসে। তাই শেলফের নিচে কয়েক ইঞ্চি ফাঁক রাখা উচিত।
আরও পড়ুনবইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ কি কমে যাচ্ছে? বইয়ের ঘ্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে স্ক্রিনের ফাঁদে
পোকামাকড় প্রতিরোধবইকে পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে কর্পুর, নিমপাতা বা লবঙ্গ কাপড়ে বেঁধে শেলফে রাখা যেতে পারে। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে পোকার উপদ্রব কমায়। যদি ম্যাসিভভাবে বইয়ে পোকা আক্রমণ করে, তবে ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল জাতীয় কেমিক্যাল ব্যবহার করতে পারেন। তবে অবশ্যই খুব সতর্কভাবে করবেন। এরপর ভালোভাবে শেলফ ও হাত পরিষ্কার করে ফেলবেন। বাচ্চাদের বইয়ের কাছে যেতে দেবেন না।
মাঝে মাঝে রোদে দেওয়াদীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়া বই বছরে অন্তত একবার রোদে দিলে পাতার আর্দ্রতা দূর হয় ও দুর্গন্ধ চলে যায়। তবে সরাসরি প্রচণ্ড রোদে দীর্ঘক্ষণ রাখা ঠিক নয়।
বই ব্যবহারে সচেতনতাবইপড়ার সময় হাতে পানি বা খাবারের দাগ থাকা উচিত নয়। পাতায় ভাঁজ না দিয়ে বুকমার্ক ব্যবহার করা উচিত। বইয়ের পাতা দ্রুত নষ্ট করতে না চাইলে বুর্কমার্ক, নন-স্টিকি নোট, কলম বা পেন্সিল ইউজ করতে পারেন। পড়া শেষে মলাট ঝেড়ে আবার শেলফে রাখতে হবে। র্যাক থেকে বই বের করার সময় স্পাইনের মাঝখানটা ধরে বের করুন। এতে বই ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না।
বাঁধাই ও মেরামতবইয়ের বাঁধাই ও মেরামত বইকে দীর্ঘস্থায়ী রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে বইয়ের বাঁধাই আলগা হয়ে গেলে পাতা ছিঁড়ে যেতে পারে বা হারিয়ে যেতে পারে। হার্ডকভার বা শক্তপত্রের বাঁধাই সবচেয়ে টেকসই আর নরম কভার বইয়ের ক্ষেত্রে শক্ত কাগজ দিয়ে নতুন কাভার তৈরি করা যেতে পারে। ছোটখাটো ছিঁড়ে যাওয়া পাতা বিশেষ বই মেরামতের আঠা দিয়ে সংযুক্ত করা ভালো। বই শেলফে সাজানোর সময় খুব শক্ত করে গাদাগাদি না করা এবং নিয়মিত মেরামত করা পড়ার সুবিধা এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
বই আমাদের আলোকিত করে, পথ দেখায়। তাই বইকে ভালোবাসার পাশাপাশি যত্ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য সচেতনতা আর নিয়মিত পরিচর্যায় প্রিয় বইগুলো দীর্ঘদিন অক্ষত থাকবে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাবে।
এসইউ