চুয়াডাঙ্গা জেলায় জলাতঙ্ক (র্যাবিস) প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের তীব্র সংকটে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি ফার্মেসি কোথাও প্রয়োজনীয় এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আহত রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারছেন না। এতে তাদের জীবন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ জানান, কুকুর, বিড়াল, শেয়াল বা অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো ভ্যাকসিন না দিলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর হাসপাতালের র্যাবিস ভ্যাকসিনের মজুত সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১৮ দিন পার হলেও নতুন করে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ আসেনি। কবে নাগাদ ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এতে জেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতালের জরুরি জলাতঙ্ক প্রতিরোধ কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত র্যাবিস ভ্যাকসিন বিতরণ কক্ষে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী রোগী ও তাদের স্বজনরা ভিড় করছেন। কিন্তু ভ্যাকসিন না থাকায় চিকিৎসা না নিয়েই হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে সবাইকে।
সদর হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত কয়েকদিনে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আহত অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী ভ্যাকসিন নিতে হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল কিংবা শহরের কোনো ফার্মেসিতেই ভ্যাকসিন না পাওয়ায় সবাইকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগীরা আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কুকুরের কামড়ে আহত ওসমান নামের একজন রোগী বলেন, চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে গেলে জানানো হয়, সেখানে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নেই এবং বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। কিন্তু শহরের একাধিক ফার্মেসিতে ঘুরেও ভ্যাকসিন পাওয়া যায়নি।
ওসমান আরও বলেন, জলাতঙ্ক যে কতটা ভয়ংকর রোগ, তা আমরা সবাই জানি। দ্রুত ভ্যাকসিন না পেলে জীবননাশের আশঙ্কা থাকে। অথচ হাসপাতালে এসেও চিকিৎসা পাচ্ছি না। আমরা চরম আতঙ্কে আছি।
আরেক ভুক্তভোগী সিফাত জানান, কুকুরে কামড় দেওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে গেলেও ভ্যাকসিন না থাকায় তাকে ফার্মেসি থেকে কিনে আনতে বলা হয়। কিন্তু শহরের প্রায় সব ফার্মেসিতে খোঁজ করেও ভ্যাকসিনের কোনো সন্ধান পাননি তিনি।
সিফাত আরও বলেন, সময়মতো ভ্যাকসিন না নিলে যে কোনো সময় বড় বিপদ ঘটতে পারে। এমন গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিনের এমন সংকট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ফার্মেসি মালিকরাও সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে হতাশা প্রকাশ করেছেন। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মোড় সংলগ্ন এক ফার্মেসি দোকানদার ইসমাইল বলেন, প্রতিদিনই বহু মানুষ র্যাবিস ভ্যাকসিনের জন্য তার দোকানে আসছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কাউকেই ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে সেই কাঁচামালের সংকট থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে বলে জেনেছি।
চুয়াডাঙ্গা শহরের আরেক ফার্মেসি মালিক খালেদ মাসুদ বলেন, কয়েকদিন ধরে সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকায় রোগীরা ফার্মেসিগুলোতে ছুটে আসছেন। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে অনেক রোগী সন্দেহ করছেন, দোকানিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্যাকসিন আটকে রেখে সিন্ডিকেট করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই আপাতত ভ্যাকসিন নেই। এমনকি অর্ডার দিলেও ভ্যাকসিন পেতে ১০ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস জানান, র্যাবিস বা জলাতঙ্ক একটি অত্যন্ত মরণঘাতী রোগ, যা কুকুর, বিড়াল, শিয়াল ও বেজির মতো প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এ রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশজুড়ে হঠাৎ করে র্যাবিস ভ্যাকসিনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সদর হাসপাতালে গত ২১ ডিসেম্বর ভ্যাকসিনের মজুত শেষ হয়েছে। নিয়মিত চাহিদা পাঠানো হলেও আপাতত সরবরাহ সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, শুধু চুয়াডাঙ্গা নয়, দেশব্যাপীই র্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট চলছে। সরকারি ও বেসরকারি কোথাও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। হঠাৎ করে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা তুলনামূলক কম, অথচ চাহিদা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
এদিকে স্বাস্থ্য সচেতন মহলের আশঙ্কা, জীবনরক্ষাকারী এই ভ্যাকসিনের সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ না নেওয়া হলে চুয়াডাঙ্গায় জলাতঙ্কজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
হুসাইন মালিক/এনএইচআর