মতামত

ব্যবসা করবেন, হিসাব বোঝেন তো!

একুশ শতকের এই প্রবল প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ‘উদ্যোক্তা’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখন ঘরে ঘরে। নতুন স্টার্ট-আপ, ই-কমার্স কিংবা সৃজনশীল ব্যবসার আইডিয়া নিয়ে তরুণরা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন বুনছে। কিন্তু এই স্বপ্নের চাকা যখন বাস্তবের মাটিতে গড়ায়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এক নিদারুণ হাহাকার। অনেক উদ্যোক্তা খুব ভালো পণ্য তৈরি করছেন, আকর্ষণীয় মার্কেটিং করছেন, এমনকি বিক্রিও করছেন আকাশচুম্বী, তবুও মাস শেষে তারা লোকসানের অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন। এর পেছনের প্রধান কারণটি অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু ভয়াবহ—হিসাবরক্ষণ বা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চরম উদাসীনতা। আমাদের দেশে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘হিসাব কিতাব বড় দায়, যে না বোঝে সে মারা যায়।’ ব্যবসার ক্ষেত্রে এই কথাটি আক্ষরিকভাবেই সত্য। একজন ব্যবসায়ী যদি তার প্রতিটি পয়সার গতিবিধি না জানেন, তবে তিনি আসলে একটি অন্ধ গন্তব্যের দিকে যাত্রা করছেন। আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফাইন্যানশিয়াল লিটারেসি’ বা আর্থিক সাক্ষরতা, একজন উদ্যোক্তার জন্য তা প্রাথমিক পুঁজির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থা ‘সিবি ইনসাইটস’ (CB Insights) তাদের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখিয়েছে যে, নতুন ব্যবসা বা স্টার্টআপগুলো ব্যর্থ হওয়ার শীর্ষ পাঁচটি কারণের মধ্যে অন্যতম হলো নগদ অর্থের সংকট বা ‘রানিং আউট অফ ক্যাশ’। প্রায় ৩৮ শতাংশ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় শুধু ক্যাশ-ফ্লো বা নগদ টাকার প্রবাহ বুঝতে না পারার কারণে। অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, পণ্য বিক্রি হওয়া মানেই লাভ হওয়া। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, বিক্রয়লব্ধ অর্থের মধ্যে উৎপাদন খরচ, পরিবহন, বিপণন, প্রশাসনিক ব্যয় এবং কর লুকিয়ে থাকে। এই যে আয়ের সাথে ব্যয়ের সূক্ষ্ম যোগসূত্র, এটি না বুঝলে ব্যবসাই আপনার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। প্রখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কথা বলেছিলেন, ‘হিসাববিজ্ঞান হলো ব্যবসার ভাষা, আপনি যদি এই ভাষা না বোঝেন, তবে আপনি একটি বিদেশী ভূমিতে মানচিত্র ছাড়া পথ চলছেন।’ এই ভাষা শিখতে আপনাকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে হবে না, তবে নিজের ক্যাশ-বুক আর ব্যালেন্স শিটের অংকগুলো বোঝার ক্ষমতা অর্জন করতেই হবে।

বড় বড় উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা হিসাবের ব্যাপারে কতটা কঠোর ছিলেন। টাটা গ্রুপের প্রাণপুরুষ জে.আর.ডি টাটা তার ডায়েরিতে ছোট ছোট খরচের হিসাবও নিখুঁতভাবে রাখতেন। তিনি মনে করতেন, অপচয় রোধই হলো লাভের প্রথম ধাপ। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ভাবেন, ব্যবসা যখন বড় হবে তখন না হয় হিসাবরক্ষক রাখা যাবে, এখন তো ছোট ব্যবসা—সব মাথাতেই আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাথায় রাখা হিসাব আর খাতার হিসাবের মধ্যে ব্যবধান যখন বাড়তে থাকে, তখনই মূল পুঁজি ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। ব্যক্তিগত খরচ আর ব্যবসায়িক খরচকে এক করে ফেলা ক্ষুদ্র ব্যবসার দেউলিয়া হওয়ার প্রধান কারণ। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রতিদিনের আয়-ব্যয় নিয়মমাফিক লিখে রাখেন, তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা অগোছালো উদ্যোক্তাদের চেয়ে তিন গুণ বেশি। ব্যবসা মানে কেবল সাহস নয়, ব্যবসা মানে হলো গণিত। আপনি কতটুকু ঝুঁকি নেবেন, তা নির্ভর করে আপনার হাতে থাকা ডাটা বা তথ্যের ওপর।

আপনার হাতে কতটুকু তরল অর্থ বা নগদ টাকা আছে যা দিয়ে আপনি কালকের বাজার সামলাতে পারবেন। অনেক লাভজনক কোম্পানিও দেউলিয়া হয়ে যায় কারণ তাদের কাগজ-কলমে লাভ থাকলেও হাতে নগদ টাকা থাকে না। একেই বলা হয় ক্যাশ-ফ্লো ক্রাইসিস। এই সংকটটি বুঝতে হলে উদ্যোক্তাকে তার হিসাবের ডায়েরির প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে। আপনার আবেগ থাকতে পারে আপনার পণ্যের প্রতি, কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক থাকতে হবে আপনার হিসাবের খাতার প্রতি।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাকিতে লেনদেন একটি বড় সংস্কৃতি। এই ‘বাকি’র হিসাব না রাখা অনেক সময় ব্যবসার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। পাওনাদার কতজন, কার কাছে কত পাওনা এবং সেই টাকা আদায়ের চক্র কতদিনের—এই সহজ সমীকরণগুলো না বুঝলে আপনার ইনভেন্টরি বা গুদাম মালামালে পূর্ণ থাকবে ঠিকই, কিন্তু ক্যাশ বাক্সে টাকা থাকবে না। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস সবসময় জোর দেন ‘ফ্রি ক্যাশ ফ্লো’র ওপর। তিনি মনে করেন, নেট প্রফিট বা নিট মুনাফার চেয়েও জরুরি হলো আপনার হাতে কতটুকু তরল অর্থ বা নগদ টাকা আছে যা দিয়ে আপনি কালকের বাজার সামলাতে পারবেন। অনেক লাভজনক কোম্পানিও দেউলিয়া হয়ে যায় কারণ তাদের কাগজ-কলমে লাভ থাকলেও হাতে নগদ টাকা থাকে না। একেই বলা হয় ক্যাশ-ফ্লো ক্রাইসিস। এই সংকটটি বুঝতে হলে উদ্যোক্তাকে তার হিসাবের ডায়েরির প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে। আপনার আবেগ থাকতে পারে আপনার পণ্যের প্রতি, কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক থাকতে হবে আপনার হিসাবের খাতার প্রতি।

ব্যবসায়িক সফলতার আরেকটি গোপন সূত্র হলো ‘মার্জিন’ এবং ‘ভলিউম’ এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝা। অনেক সময় দেখা যায়, বিক্রয় বৃদ্ধির নেশায় উদ্যোক্তারা পণ্যের দাম এতটাই কমিয়ে ফেলেন যে তাদের মার্জিন বা মুনাফার অংশ তলানিতে ঠেকে যায়। তারা ভাবেন বেশি বিক্রি করলেই লাভ হবে। কিন্তু হিসাবের অংক বলে ভিন্ন কথা, অতিরিক্ত বিক্রির জন্য যে বাড়তি লোকবল বা যাতায়াত খরচ প্রয়োজন হয়, তা অনেক সময় নিট লাভকে গিলে ফেলে। এই জায়গাটিতেই একজন সচেতন উদ্যোক্তার বুদ্ধিমত্তা ফুটে ওঠে। তিনি জানেন কোন পণ্যটি তার ‘ক্যাশ কাউ’ বা মূল আয়ের উৎস এবং কোনটি কেবল তার ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য রাখা হয়েছে। অ্যাপলের স্টিভ জবস যখন পুনরায় কোম্পানিতে ফেরেন, তখন তিনি অসংখ্য প্রোডাক্ট লাইন বন্ধ করে দিয়েছিলেন শুধু এই হিসাবের অংকের ভিত্তিতেই। তিনি জানতেন, যে পণ্য প্রফিট মার্জিন ধরে রাখতে পারে না, তা কেবল ব্যবসার বোঝা বাড়ায়।পরিশেষে বলা যায়, ব্যবসা করার ইচ্ছা আর ব্যবসা পরিচালনা করার দক্ষতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে।

আপনি যদি আজ ছোট ব্যবসার প্রতিটি টাকার হিসাব যথাযথভাবে না রাখেন, তবে কাল বড় কোম্পানি চালানোর যোগ্যতা আপনি অর্জন করবেন না। আর্থিক স্বচ্ছতা কেবল আপনাকে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয় না, এটি আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, অনিশ্চয়তা কমায় এবং প্রতিকূল সময়ে টিকে থাকার ঢাল হিসেবে কাজ করে। মনে রাখবেন, পুঁজি হলো ব্যবসার রক্ত, আর হিসাবরক্ষণ হলো সেই রক্ত চলাচলের ধমনী। ধমনী বন্ধ হয়ে গেলে যেমন শরীর অচল হয়ে পড়ে, হিসাবের গোলমাল থাকলেও তেমন ব্যবসার মৃত্যু অনিবার্য। তাই ব্যবসা শুরুর আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কি কেবল বিক্রি করতে ভালোবাসেন, নাকি সেই বিক্রির পেছনের প্রতিটি পাই-পয়সার অংক বুঝতেও সমান আগ্রহী? কারণ হিসাব যেখানে পরিষ্কার, সফলতা সেখানে দীর্ঘস্থায়ী।

লেখক : “দ্য আর্ট অব কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইনান্স ম্যানেজমেন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না, দ্য সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট ইত্যাদি বইয়ের লেখক, করপোরেট ট্রেইনার, ইউটিউবার এবং ফাইনান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট।

এইচআর/এমএস