বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আজ অত্যন্ত জটিল এবং গভীর সংকটে আবদ্ধ। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার লড়াই চলে আসছে প্রধান দুটি দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে। প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান থাকলেও দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি ব্যক্তিস্বার্থ পরিবারতন্ত্র এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে একাধিক কৌশলগত প্রশ্নে এই দুই দলের মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ আছে বলে মনে হয় না। ক্ষমতার পালাবদল হলেও শাসনের চরিত্র অনেকাংশে একই থেকে গেছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনি বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মতে তাদের প্রতি একটি রাজনৈতিক সমর্থন কাঠামো এখনও পরিলক্ষিত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক কার্যকারিতা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে একটি বাস্তব উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা রক্ষার প্রশ্নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটসহ কিছু রাজনৈতিক শক্তি ন্যায় বিচার এবং ইসলামিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাজনীতির কথা বলছে এবং নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে আনার চেষ্টা করছে। এদের অনেকেই অতীতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল। তবে সেই আন্দোলনের নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিফলন বর্তমান বাস্তবতায় কতটা দৃশ্যমান, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই দ্বন্দ্ব কেবল রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক সংহতি শান্তি এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
এই বাস্তবতা যদি আমরা মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করি তবে বহু শিক্ষণীয় দিক স্পষ্ট হয়। কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডবরা ন্যায় ও নৈতিকতার পথে অবিচল ছিল আর কৌরবরা লোভ অহংকার ও ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়েছিল। অর্জুনের নৈতিক দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। নিজের আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে গিয়ে তিনি যে মানসিক সংকটে পড়েছিলেন তা আজকের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অনেকাংশে এমন এক নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। জামায়াতে ইসলাম ন্যায় ও বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরে ধর্মীয় ও সামাজিক নীতির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলছে। তাদের লক্ষ্য নৈতিকতার ভিত্তিতে রাজনীতি। অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতা অর্জনের রাজনৈতিক সংগ্রামে সক্রিয়। তারা দেশপ্রেমের দাবি করলেও বাস্তবে অনেক সময় দলীয় স্বার্থ ক্ষমতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
এখানেই স্পষ্ট হয় রাজনীতিতে ন্যায় ও নৈতিকতার সঙ্গে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের চিরন্তন সংঘাত। কঠিন সিদ্ধান্তের সময় নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত নৈতিকতা দায়িত্ববোধ এবং দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণ।
কোরআন আমাদের এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তা যাচাই করে নিও। যেন অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়কে ক্ষতি না করো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়।’ সূরা হুজুরাত ৪৯:৬
এই আয়াত আমাদের শেখায় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হোক বা ক্ষমতার লড়াই অন্যকে অভিযুক্ত করার আগে সত্য যাচাই আত্মসমালোচনা এবং ন্যায়বিচার অপরিহার্য। রাজনীতিতে সততা দায়িত্ববোধ এবং নৈতিকতার সঙ্গে চলাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।
মহাভারতের শিক্ষাও একই বার্তা দেয়। অর্জুন দ্বিধায় পড়লেও কৃষ্ণের উপদেশে তিনি নিজের কর্তব্য ও ন্যায়পথে অবিচল থাকেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও এই শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি। ক্ষমতার জন্য রাজনীতি নয় বরং দেশের কল্যাণ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মতোই একটি নৈতিক ও দায়িত্বপূর্ণ সংঘাত। দেশের শান্তি ন্যায় এবং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সব রাজনৈতিক দলকে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির কল্যাণে কাজ করতে হবে। অন্যথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ যেমন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিরীহ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছিল।
বর্তমান প্রজন্মের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তারা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি শিক্ষিত প্রযুক্তি সচেতন এবং ন্যায়ের প্রশ্নে সচেতন। কিন্তু কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধই পারে সমাজকে সঠিক পথে নিতে। রাজনৈতিক সমর্থন বা নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে নৈতিকতা সততা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। দল বা নেতাকে সমর্থন করুন কিন্তু নিজের বিবেক বিক্রি করবেন না।
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও সুশাসনের সংগ্রাম অব্যাহত। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের জাগরণ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। যদি তারা দেশপ্রেম সততা এবং সাহসের পথে অবিচল থাকে তবে একদিন এই দেশও হবে ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ।
দায়িত্ববান নাগরিক হওয়ার প্রথম শর্ত নৈতিকতা। ভোট মানে নেতৃত্ব বেছে নেওয়া। সামান্য সুবিধার বিনিময়ে ভোট বিক্রি করা মানে নিজের ভবিষ্যৎ বিক্রি করা। তোষামোদ নয় সত্যের পাশে দাঁড়ানোই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।
গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাই গণতন্ত্রের চর্চা। যেখানে অন্যায় দেখা যাবে সেখানেই প্রতিবাদ হওয়া উচিত। গণতন্ত্র টিকে থাকে নাগরিকের সাহসে নীরবতায় নয়।
আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম। এটি ব্যবহার করতে হবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সত্য তুলে ধরার জন্য দায়িত্বশীলভাবে।
দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয় এটি জাতির মর্যাদা ও মানুষের আস্থার ওপর আঘাত। তাই দরকার নৈতিক নেতৃত্ব যোগ্যতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে রাজনীতি। তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে সেই পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে।
মানুষ জন্মায় স্বাধীন বিবেক নিয়ে। সামান্য প্রলোভনের কাছে সেই বিবেক বিকিয়ে দেওয়া আত্মমর্যাদার পরাজয়। সাহস সততা এবং দেশপ্রেম এই তিনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক নতুন বাংলাদেশ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দয়া ন্যায় এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শক্তি দিন।
রহমান মৃধা, গবেষক এবং লেখক, সাবেক পরিচালক ফাইজার সুইডেনrahman.mridha@gmail.com
এমআরএম/এমএস