মানুষের জন্য বিয়ে শুধু একটি সামাজিক সংস্কার নয়; এটি আবেগ, পরিবার, আত্মিক বন্ধন ও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিয়ে কেবল দুটি জীবিত মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন নয়। কিছু সম্প্রদায় এমন রীতি পালন করে যেখানে মৃত ব্যক্তি বা আত্মার সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন হয়।
এই রীতি মানুষকে বিস্ময়ে ফেলেছে যেখানে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বাস্তবে এই ধরনের প্রথা বহু সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে বিদ্যমান রয়েছে এবং আজও কিছু জায়গায় দেখা যায়। ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভাবমানসিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত রঙিন ও জটিল একটি বিষয়।
চীনের ‘ভূত বিয়ে’ চীনে এই রীতি অত্যন্ত পুরোনো। হান ও শাং রাজবংশের সময় থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩ হাজার বছর আগে থেকেই এটি চলে আসছে। এই রীতি মিংহুন নামে পরিচিত, যেখানে এক বা দুই মৃত ব্যক্তির আত্মার জন্য রীতি অনুসারে বিয়ে সম্পন্ন হয়। এই বিশ্বাস অনুযায়ী, অবিবাহিত আত্মারা মৃত্যুর পরের জীবনে একা থাকলে তারা আত্মিক বিপত্তি সৃষ্টি করতে পারে বা পরিবারকে অসুখ, দুর্ভোগে ফেলতে পারে বলে মনে করা হতো। তাই মৃতকে বিয়ে দেওয়া হলে তার আত্মা শান্তি পাবে এবং পরের জীবনে সুখী হবে।
চীনের উত্তর প্রদেশগুলো, যেমন শানসি, শানডং এবং হেবেই-এ, এই রীতি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল। কিছু প্রান্তিক গ্রামে এখনো কুসংস্কার হিসেবে চলছে। আত্মার একাকিত্ব ও পরিবারের দুঃখ কাটাতে বহু পরিবার বস্ত্র, মিথ্যা প্রতীক বা কবর থেকে আনুমানিক কঙ্কাল উত্তোলন করে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। কঙ্কালের গায়ে বিয়ের পোশাক পরিয়ে জীবিত ছেলে-মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয় এই বিয়েতে উপস্থিত থাকেন আত্মীয়-স্বজন। তারা আনন্দ করেন, খাওয়া-দাওয়া করেন একেবারে একটি সত্যি বিয়েতে যেভাবে করা হয়।
ফ্রান্সে আইনি মরণোত্তর বিয়েচীনের ভূত বিয়ে যেখানে আচার অনুষ্ঠান ও ক্ষুদ্র সামাজিক বিশ্বাসের অংশ, ফ্রান্সে পোস্টহিউমাস ম্যারেজ আইনি স্বীকৃত। ১৯৫৯ সালে একটি বিধান অনুযায়ী, যদি মৃত ব্যক্তি বিয়ে করার জন্য পূর্বে সম্মতি জানিয়ে থাকতো, তাহলে রাষ্ট্রপতির অনুমতিতে বিয়ে সম্পন্ন করা যায়। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ বা দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির বাগদানের পরিবারকে আইনগত মর্যাদা ও সন্তানদের বৈধতা প্রদান করা। এটি মূলত বন্যা, যুদ্ধ বা এমন পরিস্থিতিতে যেখানে জীবন দ্রুত শেষ হয়ে গেলো, তখন বাগদানের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে তৈরি করা হয়েছিল। আইন অনুযায়ী এই বিয়ে সাধারণত সম্পত্তি অধিকার বা উত্তরাধিকার সম্পর্কিত গুরুত্ব প্রদান করে না, তবে এটি মৃতের প্রতি প্রেম ও সম্মানের একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
নাজি জার্মানি ও বিশেষ পরিস্থিতি১৯৪০য়ের দশকে, নাজি জার্মানিতে মৃত সৈনীর সঙ্গে তার গর্ভবতী প্রিয়ার বিয়ে করা হয়েছিল, যাতে শিশুর জন্ম ও সমাজিক সম্মান নিশ্চিত হয়। যদিও এটি একটি বিরল আইনগত কার্যক্রম ছিল, এটি দেখিয়েছে কীভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে ব্যবহৃত হতে পারে পরিবার ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য।
আফ্রিকায় মৃত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়েআফ্রিকার কিছু উপজাতি সম্প্রদায়ে এই রীতি আজও সীমিতভাবে দেখা যায়, যা সমাজ, ধর্ম এবং বিশ্বাসের জটিল মিশ্রণ। মৃত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার এক উদ্দেশ্য হলো পরিবারের ভাগ্য বা সৌভাগ্য বজায় রাখা। আত্মার সঙ্গে এই বন্ধন বিশ্বাস অনুযায়ী পরিবারে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখে। বিশেষ করে আফ্রিকান উপজাতি সম্প্রদায়ে মনে করা হয়, মৃত আত্মা শান্ত না হলে পরিবারে দুর্ভোগের সম্ভাবনা থাকে।
বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির পরিবার সামাজিক চাপের মুখোমুখি হয়, যদি মৃত ব্যক্তি অবিবাহিত হয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পরিবারের সামাজিক মর্যাদা বজায় থাকে। দক্ষিণ সুদানের কিছু উপজাতি যেমন নুয়ের ও ডিঙ্কা জনগোষ্ঠী ভূত বিয়ে বা ঘোস্ট ম্যারেজ সংস্কৃতি পালন করে। সেখানে মৃত আত্মীয়কে বিয়ে করার রীতি রয়েছে, এমনকি মৃত ব্যক্তির ভাইকে তার স্থানে বিয়ে দেওয়া হয়। তবে এই দম্পতির যে সন্তান হবে তারা সেই মৃত ব্যক্তির সন্তান হিসেবেই বিবেচিত হবে।
আফ্রিকার উপজাতি সম্প্রদায়ে মনে করা হয়, আত্মা শান্ত না থাকলে পরিবারে অশান্তি বা দুর্ভোগ আসতে পারে। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার অন্যের হাতে চলে যেতে পারে যদি সে বিয়ে না হয়। প্রতীকী বা আইনি বিয়ের মাধ্যমে ধন ও সম্পত্তি পরিবারেই থাকে এবং সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
আরও পড়ুনগ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিয়ের আয়োজন কি হারাতে বসেছেযেখানে সবাই মেলায় জীবনসঙ্গী খোঁজে, বিয়ের আগেই মা হয় মেয়েরা
সূত্র: মিডিয়াম, দ্য গার্ডিয়ান, অ্যান্সাইন্ট অরিজিন
কেএসকে/এমএস