খেলাধুলা

একই মাঠে স্বপ্ন এবং গর্ব— বিপিএলে বাবা-ছেলের আবেগী ইতিহাস

বিপিএলে অভিষেক ম্যাচ, প্রথমবার বাবা–ছেলে একাদশে! ছেলে ফিফটি করে ব্যাট উঁচু করলেন, ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিল ড্রেসিংরুমে তালি দিতে থাকা বাবাকে— চোখে গর্বের আলো, মুখে চাপা হাসি। কী এক দুর্দান্ত অনুভূতি!

তবে এরপর যেটা হলো, সেটাকে ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। বাবাকে নন-স্ট্রাইকে রেখে ছেলে ছক্কার ফুলঝুড়ি ছোটালেন, খেললেন ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। যেন প্রতিটি বাউন্ডারিতে বলছিলেন, ‘দেখো বাবা, আমি পেরেছি।’ বো হচ্ছে, এবারের বিপিএলে ইতিহাস গড়া বাবা মোহাম্মদ নবি ও ছেলে হাসান ইশাখিলের কথা।

এবারের বিপিএল শুরুর আগেই সবার কৌতূহল ছিল নবি ও তার ছেলে ইশাখিলকে নিয়ে। তবে দু’জন স্কোয়াডে থাকলেও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের একাদশে জায়গা হচ্ছিল না ইশাখিলের। রোববার ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে অবশেষে এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টসের পর বাবা নবি নিজেই ইশাখিলকে পরিয়ে দিলেন নোয়াখালীর অভিষেক ক্যাপ।

এদিন টস জিতে আগে ব্যাটিং করতে নামে নোয়াখালী। সৌম্য সরকারের সঙ্গে নামা ইশাখিল খেলেন প্রথম বল, তার ব্যাট থেকেই আসে ইনিংসের প্রথম বাউন্ডারি। পরের ওভারে হাঁকান আরও দুই চার। ৬ ওভারে নোয়াখালীর স্কোরবোর্ডে জমা হওয়া ৬৪ রানের মধ্যে ৩২ রানই আসে ইশাখিলের ব্যাট থেকে।

৩৩তম বলে পূর্ণ করেন ফিফটি। ইশাখিল যখন ৫৮ রানে ব্যাটিং করছেন, তখন উইকেটে আসেন তার বাবা নবি। এরপর বাবাকে অন্যপ্রান্তে রেখে ঢাকার বোলারদের ওপর তাণ্ডব চালানো শুরু করেন ইশাখিল। বাবাকে দর্শক বানিয়ে ৪ বলের মধ্যে হাঁকান বিশাল ৩ ছক্কা। সামনের পা ক্লিয়ার করে লেগ সাইডে টেনে খেলছেন বিশাল শট, বটম হ্যান্ডে বোলারের মাথার ওপর দিয়ে হাঁকাচ্ছেন আকাশছোঁয়া ছক্কা—ঠিক বাবা নবি যেভাবে মারেন! প্রতিটি ছক্কা মেরেই বাবার কাছে গিয়ে বাহবা নিচ্ছেন, ছেলেকে সতর্ক থাকার পরামর্শও দিচ্ছিলেন নবি।

এদিন অবশ্য তাকে হেলমেট পরা দেখে অনেকেই হয়তো দ্বিধায় ছিলেন— এটা কে, নবি নাকি তার ছেলে? একই রকম হাঁটাচলা, একই রকম শট খেলার ভঙ্গি। শেফটাও দেখতে একই রকম। বাবা পরেন ৭ নম্বর জার্সি, ছেলের গায়ে উঠেছে সাতের আগে একটা শূন্য দিয়ে।

প্রেসবক্স থেকে গ্যালারি— সবখানে তখন একটাই আলোচনা! ইশাখিল কি পারবেন বাবাকে সামনে রেখে ক্যারিয়ারের প্রথম টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরি তুলে নিতে? তিনি অবশ্য সেদিকেই এগোচ্ছিলেন, কিন্তু বাবা নবি পারলেন না টিকে থাকতে। বাবার সঙ্গে ছেলের জুটিটা ছিল ৫ ওভারের, যেখানে রান এসেছে ৫৩টি। জুটিতে ছেলের ব্যাট থেকে আসে ১৭ বলে ৩৪, বাবার ব্যাট থেকে ১৩ বলে ১৭। এমনিতেই বাবা–ছেলে জুটি শুনলেই যে কেউ আবেগী হবেন। তবে নবি আর ইশাখিলের জুটিতে বিনোদনেরও কোনো অভাব ছিল না।

বাবা ফেরার পর ছেলেও সেঞ্চুরির আগেই ফিরে যান। ৬০ বলে ৭ চার ও ৫ ছক্কায় তার ব্যাট থেকে আসে ৯২ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস।

এর আগেও নবির সঙ্গে ম্যাচ খেলেছেন হাসান ইশাখিল। তবে সেগুলোর প্রত্যেকটিই ছিল প্রতিপক্ষ হিসেবে। কয়েকদিন আগে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন বাবার মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই ছক্কা মেরে। এবার বাবাকে সতীর্থ বানিয়েই খেললেন দুর্দান্ত এক ইনিংস। ইতিহাসে লেখা থাকবে— বাংলাদেশে প্রথমবার এক ড্রেসিংরুমে ছিলেন, একই সঙ্গে জুটি গড়েছেন বাবা নবি ও ছেলে ইশাখিল। একসঙ্গে পরেছেন জয়ের মালাও।

নবীর স্বপ্ন ছেলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা। ৪১ বছরের মোহাম্মদ নবির সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কি না বলা কঠিন। তবে বিপিএলে ঠিকই বাবা–ছেলে একই একাদশে থাকার কীর্তি গড়লেন। এর আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে পিতা–পুত্র প্রথমবার একসঙ্গে খেলেছেন আরও এক যুগ আগে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি শিবনারায়ন চন্দরপল এবং তার ছেলে ত্যাগনারায়ন চন্দরপল একসঙ্গে ১১টি ম্যাচ খেলেছেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে পিতার নেতৃত্বে খেলেছেন ত্যাগনারায়ন।

বিভিন্ন পর্যায়ের ক্রিকেটে বাবা–ছেলের একসঙ্গে খেলার আরও কিছু নজির আছে। কিংবদন্তি ডব্লিউ জি গ্রেস খেলেছেন তার ছেলে চার্লস গ্রেসের সঙ্গে। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যালেক স্টুয়ার্ট খেলেছেন বাবা মিকি স্টুয়ার্টের সঙ্গে। জিম্বাবুয়ের গ্রেট প্রয়াত হিথ স্ট্রিক খেলেছেন বাবা ডেনিস স্ট্রিকের সঙ্গে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন নজির আছে মাত্র একটি। গত নভেম্বরে তিমুর লেস্তের (পূর্ব তিমুর) হয়ে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে খেলেছেন বাবা ৫০ বছর বয়সী সুহাইল সাত্তার ও ছেলে ১৭ বছর বয়সী ইয়াহিয়া সাত্তার।

গত কয়েক দিন ধরেই নোয়াখালীর অনুশীলনে সবার বাড়তি চোখ থাকত ইশাখিলের দিকে। বাবা নবির অধীনে ব্যাটিং অনুশীলন করতেন দারুণ মনোযোগে। তার কাছেই শোনা, ‘বাবা হিসেবে নবীবি যতটা নরম, কোচ হিসেবে ততটাই কড়া!’

আর ইশাখিল বাবাকে এতটাই ভয় পান যে, তার সামনে মুখও কম নড়াতে দেখা যায়। নবির আদেশ, শুধু সাদা পানি খেতে হবে, অনুশীলনে অন্য যে পানীয় থাকে সেগুলো খাওয়া নিষেধ! নবি আশপাশে থাকলে সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকাননি ১৯ বছরের এই ব্যাটার।

ইশাখিলের বাবা নবি আফগানিস্তানের ক্রিকেট উত্থানের সবচেয়ে বড় নায়কদের একজন। আফগান ক্রিকেটের প্রকৃত পোস্টারবয় তিনি। নবি খেলতে খেলতেই আইসিসির ডিভিশন ফাইভ থেকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে আফগানরা। একুশ শতকে কোনো দেশের ক্রিকেট অগ্রগতিতে আর কারও এমন অবদান আছে কি না, বলা কঠিন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে ছোটবেলা কাটাতে পারেননি নবি। শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে। রাস্তায়, পাড়া-মহল্লায় খেলতেন টেপ টেনিস। আফগানিস্তান ক্রিকেট নামে কিছু ছিল না তখনও। শরণার্থী থেকে দেশে ফিরে নবি আফগানিস্তানকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে যাওয়ার কথা তখন ওই দেশের কেউ কল্পনাও করতে পারত না।

হাসান ইশাখিলের রাস্তাটা অবশ্য বাবা নবির মতো এতটা কঠিন হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই বাবা’ই তার জন্য পথটা সহজ করেছেন—যেমন করেছেন ইশাখিলের বয়সী আরও হাজার হাজার আফগান কিশোরের জন্য। নবিকে দেখেই তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, আফগানিস্তানে জন্ম নিয়েও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা সম্ভব।

বাবারা তো এমনই হন— সন্তানের জন্য পরের রাস্তাগুলো যেন আরও সহজ হয়, সেই চেষ্টাই করে যান। নবিও করেছেন। আর আজ রোববার চায়ের শহর সিলেটের মাটিতে চোখের সামনে ছেলেকে এমন ব্যাটিং করতে দেখে নিশ্চিতভাবেই গর্বিত হয়েছেন। নিশ্চিতভাবেই এমন খুশির দিন তার জীবনে খুব কমই এসেছে। হয়তো এজন্যই বলা হয়— ‘সন্তান জিতলে জিতে যায় বাবা।’

এসকেডি/আইএইচএস/