মানবসভ্যতার ইতিহাসে নির্মিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ স্থাপনা বা কীর্তি মিশরের গিজায় অবস্থিত দ্য গ্রেট পিরামিড অব গিজা। যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও বিস্ময়কর পিরামিড। এত বিশাল ও নিখুঁত স্থাপত্যের নেপথ্যে কে ছিলেন এই প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের কৌতূহলের বিষয়।
যদিও ফারাও খুফুর শাসনামলেই এই পিরামিড নির্মিত হয়েছিল, তবে ধারণা করা হয় না যে, খুফু নিজ হাতে এর নকশা করেছিলেন। তাহলে প্রকৃত স্থপতি কে?
গ্রেট পিরামিডের আশপাশে বেশ কয়েকটি প্রাচীন কবরস্থান রয়েছে। এসব কবরস্থানে ফারাও খুফুর পরিবারের সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ রাজকর্মকর্তাদের সমাধি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পিরামিডের পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি বিশেষভাবে বড় সমাধি-যাকে মাস্তাবা বলা হয়। এই মাস্তাবাটি আয়তাকার, সমতল ছাদবিশিষ্ট এবং ঢালু দেয়ালযুক্ত। আশপাশের অন্যান্য সমাধির তুলনায় এটি আকারে অনেক বড়।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে আবিষ্কার করেন এক প্রভাবশালী রাজকর্মকর্তার সমাধি। তার নাম হেমিউনু। সমাধির ভেতরে হেমিউনুর একটি বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন মূর্তিও পাওয়া যায়, যা তার গুরুত্বের স্পষ্ট প্রমাণ।
হেমিউনু কে ছিলেন?
হেমিউনুর সমাধি থেকে পাওয়া শিলালিপি ও তথ্য অনুযায়ী, তিনি ছিলেন মিশরের ভিজিয়ার-অর্থাৎ ফারাওয়ের পরেই রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন রাজকীয় সিলের বাহক বা ‘সিল-বেয়ারার’, যার অর্থ-রাজকীয় অনুমোদন দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা তার হাতে ছিল।
সমাধির শিলালিপিতে তাকে বিভিন্ন দেবতার পুরোহিত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অনেক গবেষকের মতে, এসব উপাধি মূলত সম্মানসূচক ছিল এবং বাস্তব দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।
ইতিহাসবিদরা অন্যান্য স্থানের শিলালিপির সঙ্গে তুলনা করে নিশ্চিত করেছেন, হেমিউনু ছিলেন যুবরাজ নেফেরমাতের পুত্র এবং নেফেরমাত ছিলেন ফারাও স্নেফেরুর সন্তান। সে হিসেবে হেমিউনু ছিলেন ফারাও খুফুর আপন ভাতিজা।
তাহলে হেমিউনুকে কেন গ্রেট পিরামিডের স্থপতি বলা হয়? এর প্রধান ভিত্তি পাওয়া যায় তার একটি বিশেষ উপাধিতে-যেহেতু ফারাও খুফুর আমলেই গ্রেট পিরামিড নির্মিত হয়েছিল, তাই যুক্তিসংগতভাবেই ধারণা করা হয়-এই বিশাল প্রকল্পের সার্বিক দায়িত্ব ছিল হেমিউনুর ওপর। তিনি সরাসরি নির্মাণ তদারকি করেছেন বলেই ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস।
তবে আধুনিক অর্থে ‘স্থপতি’ বলতে আমরা যা বুঝি-নকশা আঁকা, ডিজাইন তৈরি করা-হেমিউনুর ভূমিকা ঠিক তেমন ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তিনি হয়ত একটি প্রকৌশলী ও স্থপতিদের দলকে পরিচালনা করতেন, অথবা নকশা ও পরিকল্পনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
হেমিউনু ঠিক কীভাবে পিরামিডের নকশা প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন, তা আজও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত-গ্রেট পিরামিডের নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনিই। ফলে গিজার পিরামিডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে হেমিউনুর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
হাজার হাজার বছর পরও তাই ইতিহাসের পাতায় গ্রেট পিরামিডের সঙ্গে উচ্চারিত হয় এক নাম-হেমিউনু, পিরামিডের নীরব স্থপতি।
এমআরএম/এমএস