ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও দমন–পীড়নের খবর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে তুলে ধরছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, সিএনএন, বিবিসি এবং দ্য গার্ডিয়ানসহ প্রভাবশালী পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ইরানি সরকারের বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটিকে বিশেষভাবে সামনে আনছে।
ইরানে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ বন্ধ থাকলেও তেহরানের দক্ষিণে কাহরিজাক ফরেনসিক মেডিক্যাল সেন্টারে অস্থায়ী মর্গে কালো ব্যাগে মোড়া মরদেহের পাশে স্বজনদের আহাজারির ভিডিও পৌঁছে গেছে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে। এসব দৃশ্য ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানে মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভে নামেন। পরে সেই বিক্ষোভ দ্রুত রূপ নেয় ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় নেতৃত্ববিরোধী আন্দোলনে।
মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে গত দুই সপ্তাহে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত এবং ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির উদ্ধৃতি দিয়ে এই সংখ্যা প্রকাশ করা হলেও গত ৮ জানুয়ারি থেকে তথ্যপ্রবাহ বন্ধ থাকায় প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করছে, কিছু সহিংস বিক্ষোভকারীর হাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও নিহত হয়েছেন। এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, কয়েকজন বিক্ষোভকারী মানুষের গায়ে আগুন লাগানোসহ এমন সব কর্মকাণ্ড করেছে, যা অনেকটা আইএসের মতো।
পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ইসরায়েলপন্থি পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘অনেস্ট রিপোর্টিং’ অভিযোগ করেছে, বিক্ষোভকারীরা ইরানি শাসনব্যবস্থার পতনের স্লোগান দিলেও অনেক পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এটিকে কেবল জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদ হিসেবেই দেখাচ্ছে।
গত ২৯ ডিসেম্বর ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, কেশম দ্বীপে বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু চাই’ স্লোগান দিচ্ছেন এবং হামেদানে পাহলভি রাজবংশ পুনর্বহালের দাবি উঠছে। নিউইয়র্ক টাইমসও শিক্ষার্থীদের ‘স্বাধীনতা চাই’ স্লোগানের খবর প্রকাশ করে। দ্য গার্ডিয়ান এই বিক্ষোভকে ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এদিকে বিবিসির এক শীর্ষ সম্পাদক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলায় সমালোচনার মুখে পড়েন। সমালোচকদের অভিযোগ, গাজা ইস্যুতে এমন সতর্কতা দেখানো হয়নি।
বামপন্থি ওয়েবসাইট দ্য গ্রেজোন দাবি করেছে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রবাসী গোষ্ঠীর দেওয়া সংখ্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে এবং বিক্ষোভকারীদের সহিংসতার দিকটি উপেক্ষা করছে। তবে ইরান ওয়্যারের এক সাংবাদিক টাইম ম্যাগাজিনকে জানান, হাসপাতালগুলো গুলিবিদ্ধ রোগীতে উপচে পড়ছে এবং মৃতের সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের হুমকি নিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের মধ্যেও বিভক্তি রয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। যদিও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানের বিক্ষোভে কোনো সুসংগঠিত নেতৃত্ব নেই এবং দেশটির সেনাবাহিনীও সরকারের পক্ষে রয়েছে।
ফ্রান্স ২৪-সহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ভাইরাল ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বিভ্রান্তিকর ক্যামেরা ব্যবহারের অভিযোগ যাচাই করেছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বাস্তব চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, ইরানে ৮ জানুয়ারি রাত থেকে ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সংস্থাটি আটক সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তথ্যপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: নিউজলন্ড্রিকেএএ/