আন্তর্জাতিক

ইরানে খামেনির পতন ঘটলে বড় ধাক্কা খাবে ভারত

অর্থনৈতিক মন্দা কেন্দ্র করে ইরানে চলছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নানা কারণে বিশ্বজুড়েও উত্তেজনা বাড়ছে। আর ইরানে চলমান এই অস্থিরতা জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ভারতের জন্য, কারণ খামেনির পতন ঘটলে নানা কারণে বিপদে পড়তে পারে নয়াদিল্লি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ২৪ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে চলমান অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি জটিল ও বহুস্তরীয় চ্যালেঞ্জ। নয়াদিল্লির জন্য এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অনুসরণ করছে।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো- আদর্শের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। ইরান প্রশ্নেও নয়াদিল্লির অবস্থান বরাবরই বাস্তববাদী। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বা অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক নির্ধারণের প্রধান সূচক নয়। বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সংযোগ ও নিরাপত্তাই এখানে মুখ্য।

এই কারণেই ইরানের অস্থিরতা নয়াদিল্লিকে উদ্বিগ্ন করছে, কারণ এটি ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত পরিকল্পনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

চাবাহার ও মধ্য এশিয়া: ভারতের স্থলপথের জীবনরেখা

ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে ইরান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি কারণে, তা হলো- চাবাহার বন্দর। পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর একমাত্র বাস্তব স্থলপথ এটি।

ইরানে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে চাবাহার প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়বে। এতে ভারতের ‘কানেক্ট সেন্ট্রাল এশিয়া’ নীতির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাবে। একই সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) বিপরীতে ভারতের বিকল্প কৌশলও কার্যত নিষ্ক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নীরব হলেও কার্যকর এক ভারসাম্যকারী শক্তি। এটি পাকিস্তানের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারে অদৃশ্য বাধা হিসেবে কাজ করেছে।

ভারতের দৃষ্টিতে, ইরানে যদি এমন কোনো শাসন আসে যা ইসলামাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয় বা পশ্চিমা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য ভারতের বিপক্ষে যেতে পারে।

অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও ক্ষতির আশঙ্কা

নবভারত টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত এখনো ইরানের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানি অংশীদার। পাশাপাশি ইরানের অবকাঠামো খাতে ভারত এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে এই বিনিয়োগে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বহু বছরের কৌশলগত পরিকল্পনাও ব্যর্থ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা চাপের জটিল সমীকরণ

ইরান প্রশ্নে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক স্বার্থ- এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা সহজ নয়।

ইরানে অস্থিরতা বাড়লে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপও বাড়বে। এতে নয়াদিল্লিকে হয়তো আরও সতর্ক ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যাতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গেও দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হয়।

অবশ্য অনেকে মনে করেন, ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে তা ভারতের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারণা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই স্থিতিশীলতা বা উদার শাসন নিশ্চিত নয়।

বরং বিশৃঙ্খল রূপান্তরের ফলে যদি আরও চরমপন্থী বা অনিশ্চিত কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে ভারতের কৌশলগত হিসাব আরও জটিল হয়ে উঠবে।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিতে ইরান একটি ‘অপরিহার্য কিন্তু সংবেদনশীল অংশীদার’। ইরানের স্থিতিশীলতা ভারতের শুধু অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এই কারণে নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে সংযত অবস্থান নিলেও নীরবে ইরানের পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে। কারণ ইরানে যে কোনো বড় অস্থিরতা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বহু স্তম্ভকেই একসঙ্গে নাড়িয়ে দিতে পারে।

সূত্র: নিউজ২৪ (ভারত)

এসএএইচ