দেশে কৃষির ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের ফলে কৃষক ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘ক্যানসার রোগীগের শতকরা ৬৪ শতাংশ যে কৃষক, এটি তো এমনি এমনি হয়নি। বর্তমানের যে উন্নয়ন ধারা তারই একটি ফলাফল। কৃষকরা ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে, অকৃষকরা ভাবে এটি তো আমাদের মধ্যে আসবে না। কিন্তু আল্টিমেটলি তো তাদের কাছেই আসছে।’
রোববার (১৮ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। নিরাপদ, ন্যায্য, জলবায়ুসহিষ্ণু, লাভজনক, স্বাস্থ্যকর, দূষণমুক্ত, টেকসই ও সার্বভৌম কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা বিষয়ক ২০ দফার বাস্তবায়ন চাই’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির দাবি তুলে ধরেন নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলনের মুখপাত্র লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘দেশে উৎপাদন বাড়লেও কৃষক আত্মহত্যা করছে। কৃষকরা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গ্রামে ফসল বাড়ছে, কিন্তু পানিতে বিষ। ভূপৃষ্ঠের পানি কমে যাচ্ছে। খাদ্য বিষাক্ত হয়ে উঠছে।’
তিনি বলেন, ‘ক্যানসার রোগীদের বড় অংশই কৃষক। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। বর্তমান উন্নয়ন ধারারই ফল। এই সমস্যার প্রভাব শুধু কৃষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে কৃষি উৎপাদন চার গুণের বেশি বেড়েছে। খাদ্য, মাছ ও সবজি উৎপাদনে একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এটিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। উৎপাদন বাড়লেও কৃষক আত্মহত্যা করছে। কৃষকরা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘সবুজ বিপ্লবের পর কৃষি গবেষণা হওয়া উচিত ছিল দেশীয় জাত, পানি সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা নিয়ে। কিন্তু গবেষণা হয়েছে কীভাবে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো যায় তা নিয়ে। এর ফলে মাটি, পানি ও মানুষ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি এখন শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, এটি অসুস্থতা তৈরির এক বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রশ্ন তুলছে না। বরং পুরনো উন্নয়ন চিন্তার পুনরুৎপাদন হচ্ছে। তাই সমাজের সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে।’
এদিকে, দেশে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ফসলের বীমা, কৃষকের ঝুঁকি ভাতা চালু, কৃষি কার্ড প্রদান ও স্থানীয় বীজ নির্ভর কৃষির প্রসারসহ ২০ দফা দাবি তুলে ধরে ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন’। সংগঠনটির প্রত্যাশা, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল এবং প্রার্থীরা নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক এসব প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করবেন এবং এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করবেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আন্দোলনের মুখপাত্র লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, ‘আমরা হঠাৎ করে কিংবা এখনই এই ২০ দফা বাস্তবায়ন করতে বলছি না। নিরাপদ কৃষির স্বার্থে এটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নয়—বরং স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন। এতে কৃষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের মাটি অনুর্বর ও পুষ্টিহীন হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আন্দোলনের আরেক মুখপাত্র কৃষক দেলোয়ার জাহান বলেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ৭২ শতাংশ মাটিতে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় যে পুষ্টি সেটি নেই। দেশের মাটিতে জিংকের ঘাটতি আছে প্রায় ৬০ শতাংশের ওপরে। এর মানে হচ্ছে, দেশের ৬০ শতাংশ মানুষের শরীরেও জিংকের ঘাটতি রয়েছে। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। কোনো ভাইরাস আক্রমণ করলে দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হবে। দেশের মাটি ভালো রাখতে হবে, বিষ প্রয়োগ করা যাবে না। নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ইএইচটি/এমএমকে/জেআইএম