নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্ববাজারে সোনার দামে ব্যাপক উত্থানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে একের পর এক রেকর্ড। দফায় দফায় দাম বেড়ে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বাজারে এক আউন্স সোনার দাম প্রথমবারের মতো ৪ হাজার ৬৫০ ডলারে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে দেশের বাজারেও যে কোনো সময় সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে এবং সর্বোচ্চ দামের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কার মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ায় মূল্যবান এ ধাতুটির মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনীতিতে ধীরগতির আশঙ্কা, বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত এবং ডলারের ওঠানামা সোনার বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। এরই মধ্যে চলতি বছরে দেশের বাজারে কয়েক দফা সোনার দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বর্তমানে দেশের বাজারে সোনা সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে।
গত ১৫ জানুয়ারি দেশের বাজারে সোনার দাম সর্বশেষ নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ১৪ জানুয়ারি ঘোষণা দিয়ে ১৫ জানুয়ারি থেকে সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ২ হাজার ৬২৫ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ২ হাজার ৫০৮ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ২ লাখ ২৪ হাজার ৭ টাকা।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ২ হাজার ৯৯ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনায় ৩৫০ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৩১ টাকা। দেশের বাজারে এটিই এখনো পর্যন্ত সোনার সর্বোচ্চ দাম। বর্তমানে এ দামেই সোনা কেনাবেচা চলছে।
তবে শিগগির এই রেকর্ড ভেঙে সোনার দামে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বাজুসের এক সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, দুদিন বন্ধ থাকার পর আজ (সোমবার) বিশ্ববাজারে আবার লেনদেন শুরু হয়েছে। লেনদেনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এরই মধ্যে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৭০ ডলারের ওপরে বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজারে এমন দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই দেশের বাজারেও দাম বাড়বে। এতে আবারও সর্বোচ্চ দামের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাম্প্রতিক ভূমিকায় বিশ্বজুড়ে উত্তেজনাকর অবস্থা বিরাজ করছে। এতে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, এখন কেউ অনুমান করতে পারছে না। এসব অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপের অর্থনীতিতে ধীরগতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে সোনায় বিনিয়োগ করছেন।
তিনি আরও বলেন, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করায় ইউরোপের আটটি দেশের পণ্যের ওপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। ‘গ্রিনল্যান্ডের সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক ক্রয়’ বিষয়ে কোনো সমঝোতা না হলে আগামী জুনে এ শুল্কহার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে।
এ ঘোষণার পর ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয় নেতারা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে জরুরি বৈঠকে বসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপসহ সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সবকিছু মিলেই সোনার দামে এমন উল্লম্ফন হচ্ছে—অভিমত এই বাজুস সদস্যের।
বিশ্ববাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৫০ মিনিটের দিকে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৬৮ দশমিক শূন্য ২ ডলার বেড়ে ৪ হাজার ৬৬৩ ডলারে উঠে এসেছে। অবশ্য দুপুর ১টার দিকে প্রতি আউন্স সোনার দাম রেকর্ড ৪ হাজার ৬৭৮ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৯৮০ সালে এক আউন্স সোনার দাম ছিল ৮৫০ ডলার। তা বেড়ে ২০০৮ সালে হয় ৮৬৫ ডলার। ২০১১ সালে নতুন রেকর্ড গড়ে এক আউন্স সোনার দাম ওঠে ১ হাজার ৯১৩ ডলার পর্যন্ত। এরপর কয়েক দফায় দাম বেড়ে ২০২৫ সালের মার্চে প্রতি আউন্স সোনার দাম প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ডলার স্পর্শ করে।
অবশ্য এই রেকর্ড গড়েই থেমে থাকেনি সোনা। ২০২৫ সালে কয়েক দফায় সোনার সর্বোচ্চ দামের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ওই বছরের এপ্রিলে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩ হাজার ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বছরের মাঝামাঝি সময়ে সেই দাম ওঠে ৩ হাজার ৫০০ ডলারে। অক্টোবরে প্রথমবার প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। বছরের শেষদিকে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৫৫০ ডলার।
বিদায়ী বছরে বিশ্ববাজারে সোনার দাম যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে তেমনই দেশের বাজারেও একই ধারা অব্যাহত থাকে। বছরজুড়ে মোট ৯০ বার সোনার দামে পরিবর্তন আসে। যার মধ্যে দাম বাড়ে ৬৩ বার আর কমে ২৭ বার। এতে এক বছরের মধ্যে প্রতি ভরি সোনার দাম ৮৮ হাজার ৬৩৫ টাকা বা ৬৪ শতাংশ বেড়ে যায়। সোনার সর্বোচ্চ দামের ক্ষেত্রে হয়েছে একের পর এক রেকর্ড।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০০ সালে বাংলাদেশে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ছিল ৬ হাজার ৯০০ টাকা। এরপর কয়েক দফা বেড়ে ২০১০ সালে দাম ওঠে ৪২ হাজার ১৬৫ টাকা। দেশে এক ভরি সোনার দাম প্রথম ৫০ হাজার টাকা হয় ২০১৮ সালে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রতি ভরি সোনার দাম বেড়ে হয় ৬০ হাজার ৩৬১ টাকা।
দেশের বাজারে এক ভরি সোনার দাম প্রথম ১ লাখ টাকা হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা প্রথমবার ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা স্পর্শ করে। মাত্র আট মাসের ব্যবধানে ভরিতে ৫০ হাজার টাকা বেড়ে দেশের বাজারে ভালো মানের সোনার দাম প্রথমবার ২ লাখ টাকা ছোঁয় একই বছরের ৭ অক্টোবর। এরপর আরও কয়েক দফা সোনার দাম বাড়ে।
বছরের শেষ সময়ে এসে টানা পাঁচবার বাড়ে সোনার দাম। এতে বছর শেষে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ওঠে ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকা পর্যন্ত।
এমএএস/এমকেআর