সন্ধ্যাবেলা। প্রতিবেশীদের সহায়তা নিয়ে আবছা আয়োজন। উঠোনের এক কোণে হাতলভাঙা কয়েকটা চেয়ার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ঘটকের কথামতো পানির পরিবর্তে চিনির শরবত। মা নেই, তাই জেবুকে সাজিয়ে দিয়েছে প্রতিবেশী এক ভাবি; নিজের কস্তাপেড়ে শাড়ি, জলঙ্গা রং ব্লাউজ, লাল পেটিকোট ও গয়নাগাটি দিয়ে। কনের সাজে জেবুকে যে দেখে সে-ই তাজ্জব বনে। এত সুন্দর মেয়েটা! বরপক্ষ আসতে খুব একটা দেরী নেই। ঘরে ঢুকল সে। কনের সাজে বড় বোনকে কখনো দেখেনি বেঙ্গা। এই প্রথম। আনন্দে তার চোখ ভিজে গেল। ‘আজ তোমাকে পছন্দ করবেই রে বুবু!’ চোখ মুছে নিয়ে উচ্ছ্বাসের হাওয়ায় উড়তে লাগল সে।‘কেন? দেখতে এমন কী আমি?’ জেবু হাত আয়নায় মুখ দেখছিল, মুখ সরাল। ‘আমার বুবু রাজকন্যার মতো!’‘রাজকন্যা কেমন, দেখেছিস?’‘না, তবে সখীর মতো হবে হয়তো।’‘থাক, আর বলতে হবে না! বমি আসছে,’ রোষ-কষায়িত চোখে বলল জেবু।জেবুকে সাজিয়ে দেওয়া সেই ভাবি ঘরে ঢুকে বলল, ‘পাত্রপক্ষ এসে গেছে। আমার সঙ্গে নামবে।’
বর ও বরপক্ষের জন্য চেয়ার এক সারিতে রাখা হয়েছে। সামনের খালি চেয়ারটা কনের জন্য। পানচিনির অনুষ্ঠান; অতীব দায়সারা ও সাদামাঠা। কনে এসে তাদের সালাম দিয়ে খালি চেয়ারে বসল। বরের একপাশে বাবা, আরেক পাশে মা। তাদের পেছনে ঘটক। লম্বা ঘোমটার কারণে কনের মুখাবয়ব ভালোমতো দেখা যাচ্ছিল না; কনের পেছনে দাঁড়ানো ভাবিকে ঘোমটা ওপরের দিকে টানার ইঙ্গিত দিলেন বরের বাবা। সম্পূর্ণ মুখদর্শন করার পর বরের মা হৃষ্টচিত্তে বললেন, ‘মাশাল্লাহ! বউমা আমার পছন্দ হয়েছে।’সবার হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে শরবত। একটু একটু করে গলায় ঢালছিল, আর খোশগল্প করছিল।
ঘরের মধ্যে বেঙ্গা একা। নতুন জামা পরে আছে, তাই তার মনের অবস্থা অন্যদিনের চাইতে ভালো। আরও ভালো হতো যদি বুবুর সঙ্গে থাকতে পারত সে। কিন্তু বুবুর নিষেধ। তার মন ছটফট করছিল। একবার যদি হবু দুলাভাইকে দেখতে পারতাম! মানুষটা কেমন? বিদেশি ডাক্তারের মতো? কৌতূহলের মাত্রা বাড়ছিল তার। বাড়তে বাড়তে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ল। নিজেকে ঠেলতে ঠেলতে দরজার দিকে নিয়ে গেল; দরজা ঠেলে একেবারে চৌকাঠের ওপর। গুঁইসাপের মতো মাথাটা ওপরে তুলে দুলাভাইকে দেখার চেষ্টা করল। দুলাভাইয়ের মুখে রুমাল। তবুও ধরে নিলো এই তার দুলাভাই। চিকন করে হাসল সে।
বরের মায়ের নজরে ধরা পড়ল দৃশ্যটি। অদ্ভুত প্রাণির মতো মনে হলো তাকে। চুপিসারে চেয়ার ছাড়লেন তিনি। অতি উৎসাহে প্রাণিটাকে দেখার জন্য কাছে এলেন। এরপর অবাক হলেন।হতচকিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে বাবা?’বেঙ্গা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ভদ্রমহিলা একেবারে তার মুখের ওপর। নিজেকে লুকাতেও পারছিল না। অবশেষে ভ্যাবাচেকা কণ্ঠে শুধু বলল, ‘আমি ওর ছোটভাই।’মহিলা তৎক্ষণাৎ সরে এসে আগের জায়গায় বসলেন। তবে তার ভঙ্গিমা আমূল বদলে গেছে। গম্ভীর মুখ। অস্থির ভাব। হবু বউমার উদ্দেশে বললেন, ‘বউমা, তোমার কোনো ভাই আছে?’জেবু আর কী বলবে, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো, ‘আছে।’‘তাহলে আগে বলোনি কেন?’ তার গলায় উষ্মা।‘ঘটকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনাদের সঙ্গে হয়নি।’ জেবুর সাফ জবাব।‘ঠিক আছে! সাতদিন পর আমরা জানাব।’ উঠে পড়লেন তারা।
০৭.কত সাতদিন গেল! খবর পাচ্ছিল না তারা। ঘটকও এড়িয়ে চলছিল। বুঝতে বাকি রইল না এ বিয়েটাও ভেঙে গেছে। বেঙ্গা জানলে কষ্ট পাবে, তাই কৌশলে উত্তর দেয় সে, ‘হবে হবে। বিয়ার ব্যাপার-স্যাপার, বুঝিস না? একটার পর একটা জট লাগতেই থাকে। এই হবে হবে করেও হয় না, আবার হবে না করতে করতেও হয়।’যারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকে, তাদের অন্তর্দৃষ্টি প্রখর হয়; এতে কোনো সন্দেহ নেই। বুবুর কথায় আঁচ করল বেঙ্গা এ বিয়েটাও ভেঙে গেছে। তার মেজাজের পারদ ওপরের দিকে। উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘আর কত মিথ্যা বলবে, বুবু? বলো, এ বিয়াটাও ভেঙে গেছে?’এতদিন অসহায়, পঙ্গু ভাইকে আগলে রাখার জন্য বিয়েতে তেমন মত ছিল না তার। যৌবনের তো একটা কামড় আছে! সেই কামড়ের কারণে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছে। রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে ফেটে পড়ল সে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, গেছে! তোর কারণে! তোকে ওরা দেখেছে। তোর কারণে আমার জীবনটা আজ তেনাতেনা! তোর মৃত্যু হয় না! আল্লাহ তোকে উঠিয়ে নিতে পারে না! তাহলেই তো বাঁচতাম!’
তখন থেকে বেঙ্গার চিন্তাচেতনায় নতুন গতির সংযোজন ঘটল। এই প্রথম স্কুলমাঠে গিয়ে সে এত মানুষ দেখেছে। তার মনে সুদর্শন পুরুষের কোনো আইডল নেই। বিদেশি ডাক্তার তার মনে গেঁথে গেছে। এরকম ধবধবে শাদা ও সুন্দর হতে চায় সে। তাকে দেখলেই সখী যেন তার প্রেমে গদগদ হয়। লাল শাড়ির ঘোমটা পরে নিজেই যাতে তার বউ হওয়ার বাহানা খোঁজে। তাকে দেখার পর বরপক্ষ বুবুর বিবাহ যাতে না ভাঙে। তার ধ্যানজ্ঞান হলো বর্তমান খোলস ভেঙে নতুন রূপে নতুন আঙ্গিকে আবির্ভুত হওয়া। তাকে দেখলে সবাই চমকে যাবে। সমস্বরে বলবে, ওয়াও! বুবুর কাছে শুনেছিল, প্রতিদিন আল্লাহুস সামাদ ১০১ বার পাঠ করলে আল্লাহ তার মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। ‘আল্লাহুস সামাদ’কে জিকির হিসেবে নিলো সে।
চলতে থাকল জিকির। বলা চলে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা। শয়নে-স্বপনে। এমনকি খাদ্য গ্রহণের সময়ও। এমন নিবিষ্ট জিকিরকারী আগের দিনের দরবেশদের মধ্যেও ছিল না। অনবরত তার বিড়বিড় করা দেখে তার বুবু কিংবা সখী ধন্দে পড়ে। তার এ রহস্যময় আচরণ জানতে চাইলে ‘ও কিছু না’ বলে উড়িয়ে দেয় সে।
মাসদেড়েক পর তার মনে হলো, এখন আল্লাহর কাছে কিছু চাইতেই পারে সে। মোনাজাতের ভঙ্গিতে দু’হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে আল্লাহর উদ্দেশে বলল, ‘হে আল্লাহ! তোমার কাছে বেহেশত চাই না। ধন-দৌলতও না। আমাকে দয়াকরে বিদেশি ডাক্তারের মতো সুন্দর করে দাও। সুস্থ করে দাও। কেউ যাতে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা না করতে পারে।’
হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ঝলকানি দেখতে পেল সে। হাতের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল সে সুন্দর হয়ে গেছে। লক্ষ্য করল, তার বুকের জমিন, তলপেট, পা, আঙুল, সবকিছুতেই নূরের ঝলকানি। সেই বিদেশি ডাক্তারের মতো ধবধবে ফর্সা। তার অবিশ্বাস্য পরিবর্তনে নিজেকেই বিশ্বাস করাতে পারছিল না। অনেকদিন থেকে নখ কাটানো হয়নি। নখ কেটে দেয় তার বুবু; সে-ও সময় পায়নি। ফলে নখগুলো বেশ বড় ও শক্ত হয়ে উঠেছে। হিংস্র জন্তুর নখরের মতো। সেই নখ দিয়ে এত জোরে চিমটি কাটল তার হাতে, সঙ্গে সঙ্গে রক্ত ফুটল; কিন্তু ব্যথা অনুভব করল না সে। কারণ তার মনে বেপরোয়া খুশি। কী করবে, ভেবে পাচ্ছিল না! আনন্দোত্তেজনায় এপাশ-ওপাশ গড়াগড়ি করল কতক্ষণ। কোনোদিন নিজ থেকে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে না; আজ করল। কুলুঙ্গিতে মুখ দেখার ছোট্ট একটা আয়না থাকে, তা আনতে চায় সে। কিন্তু ঈশ্বর সে শক্তি তাকে দিলো না। এমন সময় সখী এসে হাজির। তাকে দেখামাত্র দাঁত কেলিয়ে বলল, ‘হে হে, এখন থেকে আর আমাকে কুৎসিত বলতে পারবে না। দেখো, আমাকে দেখো, আমি কত সুন্দর হয়ে গেছি! তাই না? আর ‘না’ করতে পারবে না।’
কী কারণে বেঙ্গা এমন দাবি করল তা তার বোধগম্য হলো না। তবে স্তম্ভিত সে। ভেবে কূল পাচ্ছিল না কী বলবে! হঠাৎ রগড় করে সমাধান খুঁজল, ‘হ, হ, তোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। সেই বিদেশি ডাক্তারের মতো। গায়ের রং কী ফকফকা! সোনাজাদু রে! আজ তোকে পায়েস রাইন্ধা খাওয়াতে ইচ্ছা করছে। আয়, আপাতত একটা চুমু দেই।’ প্রায় দৌড়ে গিয়ে বেঙ্গার কপালে সশব্দে চুম্বন করল সে। এই চুম্বন ভালোবাসার না, এই চুম্বন কামনার না, এই চুম্বন উপহাসের—ঠাট্টা-তামাশার। তার প্রমাণ, পরক্ষণেই মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল সে, ‘তেলাপোকা তেলাপোকাই থাকে, বুঝলি? আকাশে উড়লেই পাখি হয় না। সুন্দর না ছাই!’‘তার মানে আমি কী আগের মতোই অসুন্দর?’ বিভ্রান্ত হলো সে।‘নয়তো কি! আয়নায় মুখটা দেখ।’ কুলুঙ্গিতে রাখা আয়নাটা এনে তার মুখের সামনে ধরল সখী। নিমেষেই তার মুখে যেন এক থাবা লবণ পড়ল। চিন্তার বড় ধাক্কা খেল সে। তার মানে এতক্ষণ নিজেকে সে যা দেখেছে তা ঘোরের মধ্যে!
০৮.পরের দিন সকালে আড়তে যাওয়ার আগে তার বুবু তাকে ভাত খাওয়াচ্ছিল; হঠাৎ মুখটা ম্যাড়মেড়ে করে বলে, ‘একদম নুন হয়নি।’‘বেশি নুন খাওয়া ভালো না।’‘ভালো নয় কেন?’‘অত্যধিক নুন খেলে প্রেসার বাড়ে। প্রেসার ভয়াবহ বাড়লে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক হতে পারে। মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে।’ভাত খাইয়ে দেওয়ার পর বেঙ্গার মুখ ধুইয়ে দিয়ে আড়তে যাওয়ার আগে বলল সে, ‘আবহাওয়া ভালো ঠেকছে না। এ সময়টাতে হঠাৎ টর্নেডো হয়। সাবধানে থাকিস।’
দুপুরে সখী আসার কথা, আসেনি। মন খারাপ করল সে। দারুণ অবহেলা, অপরিসীম ঘৃণা আর বস্তাভর্তি একাকিত্বের ভার বইতে পারছিল না আর। তার কারণে বুবুর বিয়ে ভেঙে যাওয়া, তার প্রতি সখীর ঘৃণা; কসেল্লাজারিত জীবনকে তুচ্ছ মনে হলো তার। হতাশা আর অনিশ্চয়তার দোলাচলে নদীভাঙনের মতো ধসে পড়েছে তার স্বপ্নতীর। পচা, দুর্গন্ধময় তার এই আঁটকপালে জীবন ক্রমশ অর্থহীন মনে হলো। গভীর বিষণ্নতার চোখে খোলা দরজার দিকে তাকাল সে। ঝড়ো বাতাসে দরজা ভূতুড়ে আচরণ করছিল। একবার খোলে, একবার বন্ধ হয়। বেড়ালের রহস্যময় ডাকও শুনতে পেল। ভীত না হয়ে তেরচা চোখে লবণের বয়েমটা খুঁজল। ওই তো বয়েমটা! টেনেহেঁচড়ে নিজের আয়ত্তে আনল সে। স্বেচ্ছায় যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে, তার কাছে কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। লবণকে তার চিনি মনে হলো। থাবা থাবা লবণ পেটে চালান করল। ধাঁ করে তার প্রেসার বাড়তে লাগল।
বিকেলের পর তুমুল ঘূর্ণিঝড়; সঙ্গে মুষল বৃষ্টি। দূরের সুপারি বাগানের মাথার ওপর সমুদ্র ঢেউ। যেন কেয়ামত আরম্ভ হয়ে গেছে। চালের টিন, খড়ের ছাদ খড়কুটোর মতে উড়ে যাচ্ছিল। গাছপালা আছড়ে পড়ছিল। কর্ণবিবরে ভেসে আসছিল গবাদিপশুর মর্মান্তিক ডাক! জেবু পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে আড়ত থেকে বাড়ির দিকে ছুটল। বাতাসের বেগ এতটাই প্রবল, রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ছিল সে।
বাড়িতে পৌঁছে দেখে সব লন্ডভন্ড। খুপড়ি ঘরটা ভেঙে আবর্জনার স্তূপ হয়ে পড়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে স্তূপ সরাচ্ছিল সে। কিছুক্ষণ বাদে সখীও এসে তার সাথে যোগ দিলো। স্তূপের নিচে তারা খুঁজে পেল বেঙ্গাকে। ততক্ষণে সে তার অভিশপ্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে। ভাইকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বিলাপ করছিল জেবু। সখীর মনে একটু হলেও বেঙ্গার জন্য জায়গা তৈরি হয়েছিল, সেখানে হড়পা বানের মতো বিষাদের ঢেউ আছড়ে পড়ল; হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে-ও।
আগের পর্ব পড়ুন>> জিল্লুর রহমান শুভ্রর গল্প: বেঙ্গা- পর্ব ০১ >> জিল্লুর রহমান শুভ্রর গল্প: বেঙ্গা- পর্ব ০২
এসইউ