গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচার চালাতে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট বিষয়ক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে সিলেটের বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
শনিবার সকালে সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সিলেট বিভাগীয় প্রশাসন এ সভার আয়োজন করে। বিভাগীয় সদর এবং জেলা ও উপজেলায় কর্মরত সরকারী কর্মকর্তা, বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
আলী রীয়াজ বলেন, জুলাইতে যারা রক্ত দিয়েছেন, যাদের বেওয়ারিশ লাশ এখনো খুঁজে ফিরছেন তাদের স্বজনরা, তারা শুধু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ এই গণভোট। বিদ্যমান সংবিধান, আরপিও, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কিংবা এই গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশের কোথাও বলা নেই যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলতে পারবেন না। প্রচারণায় আইনগত বাধা আছে এমন কোনো রেফারেন্স কেউ দেখাতে পারবে না। যারা এ বিষয়ে বাধা আছে বলে প্রচার করছে, তারা ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা নৈতিকভাবে গণভোটের পক্ষে প্রচার করতে পারেন কি না- এমন প্রশ্ন যারা তুলছেন তাদের উদ্দেশে আলী রীয়াজ পালটা প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা কোন নৈতিকতার কথা বলছেন- যে নৈতিকতা তাজা তরুণদের রক্তকে, তাদের আত্মদানকে অস্বীকার করে?
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিবেচনা করে তাদের এমন দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে বিশেষ সহকারী বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে যে বৈধতা, তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই অন্তর্বর্তী সরকার। এটা মোটেই কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছে-সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। নির্বাচন সরকার আয়োজন করে না; অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে সরকার, আর নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বিচারও আদালত পরিচালনা করবে, সরকার শুধু বিচার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করছে। তাই সরকারের মূল ম্যান্ডেটই হলো রাষ্ট্র সংস্কার।
অনেকে দাবি করেন এমন গণভোট এর আগে কোথাও হয়নি, এ বিষয় উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, এর আগে ১৯৭২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৪৮টি গণভোট হয়েছে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। সুতরাং আন্তর্জাতিকভাবে এটা গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা, নৈতিকভাবে এটা আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব এবং আইনগতভাবে এতে কোনো বাধা নেই।
গণভোটে এত প্রশ্ন, এত বিষয়, সেটা সাধারণ মানুষ বুঝবেন না- এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে আলী রিয়াজ বলেন, সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে দেশ স্বাধীন করতে পারবেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান করতে পারবেন, কিন্তু মানুষের অধিকারের প্রশ্ন আসলে সেটা জনগণ বুঝবেন না- আমি তার সঙ্গে একমত নই। এর মধ্যদিয়ে মানুষকে অসম্মান আর হেয় করা হচ্ছে।
আলী রীয়াজ বলেন, বিগত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাঁতাকলে যারা পিষ্ট হয়েছেন, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন, জেল–জুলুম–নিপীড়ন সহ্য করেছেন, গুমের শিকার হয়েছেন, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তারা আমাদের হাতে একটা দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। এই দায়িত্ব হলো, আগামীদিনে বাংলাদেশ যেন একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নীত হতে পারে, তার জন্য যেন আমরা দায়িত্ব পালন করি।
বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অপরিমেয় একক ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১১ সালে তৎকালীন সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য যে কমিটি তৈরি করেছিল, সেই কমিটি ২৫টি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় যে কিছু পরিবর্তনসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অব্যাহত থাকবে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কমিটির একটি মাত্র বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটা বাতিল হয়ে যায় একজন মাত্র ব্যক্তির ইচ্ছায়।
তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন, কর্ম কমিশন অথবা বিচারপতি নিয়োগ রাষ্ট্রপতির করার কথা থাকলেও বাস্তবে এর সবকিছুই প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে হয়।
প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারী বলেন, একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব আর সংবিধান নিয়ে এই ছেলেখেলা বন্ধ করার জন্যই জুলাই সনদ এবং গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
এসময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, আগের ফ্যাসিবাদী শাসকের আর ফেরার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু ফ্যাসিবাদ ফেরার সম্ভাবনা আছে যদি আমরা রাস্তা বন্ধ না করি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অনেক বাবা-মায়ের সন্তান প্রাণ হারিয়েছে। আগামীবার যদি ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে তাহলে আমার-আপনার সন্তানের প্রাণ যেতে পারে। ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার এই চক্র ভেঙে দিতেই এবারের গণভোট হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যে প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই কিন্ত এই গণভোট। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মুক্তিযুদ্ধের যে লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছিল, পরে সেই উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যের কথা সংবিধানের মূলনীতিতে আর রাখা হয়নি। ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার তথা ইনসাফ, স্বাধীনতার এই ৫৪ বছর পরও আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
এবারের গণভোট স্বাধীনতার সেই মূল চেতনার আলোকে দেশ গড়ার পথে একটি সুবর্ণ সুযোগ উল্লেখ করে মনির হায়দার এই সুযোগ সবাই যেন কাজে লাগাতে পারে সে লক্ষ্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় বিশেষ অতিথি ধর্মসচিব মো. কামাল উদ্দিন গণভোটে ‘হ্যা’ এর পক্ষে প্রচার করা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দায়িত্ব উল্লেখ করে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ রেখে যেতে পারবো।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান, সিলেটের পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার নাজির আহমদ প্রমুখ।
সভায় সিলেট বিভাগের জেলাসমূহের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং এনজিও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
এমইউ/ইএ