মওলবি আশরাফ
বিয়ের বিষয়ে আমাদের সমাজের প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো—মেয়ের মা-বাবা ও পরিবারের মুরুব্বিরা মিলে যে পাত্রকে ভালো মনে করেন, তার সাথেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করবেন। পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণত সমপর্যায়ের হওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা ও মেয়ের ভবিষ্যত সুখময় হওয়া ইত্যাদি বিবেচিত হয়। অনভিজ্ঞ নবযৌবনা মেয়ের তুলনায় যেহেতু মুরুব্বিগণই পাত্র সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, তাই এই নিয়মই চলে এসেছে। মৌলিকভাবে এটি মন্দ কিছু নয়, বরং বিয়ে-শাদি যেহেতু একটি সামাজিক বিষয়, তাই দুই পরিবারের সবার বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই তা হওয়া কল্যাণকর। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়—প্রবল অনিচ্ছা ও আপত্তি সত্ত্বেও মেয়েকে পরিবারের পছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে বসতে বাধ্য করা হয়। যেন-বা মেয়ের ভালো লাগা বা মন্দ লাগার কোনো গুরুত্বই নেই, সে পরিবারের নেওয়া সব সিদ্ধান্তই মেনে নিতে বাধ্য।
ইসলাম বিষয়টিকে এভাবে দেখে না। বরং বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর সিদ্ধান্তকে খুবই গুরুত্ব দেয়, এবং পরিবারকে অপছন্দের কাউকে বিয়েতে বাধ্য করতে নিষেধ করে। এমন কি শরিয়ত এ কথাও বলে—প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মেয়েকে যদি তার অমতে বিয়ে দেওয়া হয়, আর সে যদি মামলা করে, বিচারক তখন এই বিয়ে ভেঙে দিতে পারবে।
খোদ আল্লাহর রাসুলের (সা.) সময়কালে এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। তিনি বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের নিজের সম্মতি ও ইচ্ছাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এক তরুণী রাসুলের (সা.) কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, আমার বাবা তার ভাতিজার সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছেন, যেন তিনি তাকে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারেন।
রাসুল (সা.) তখন বিয়ে রাখা না রাখার এখতিয়ার মেয়েটির ওপর ছেড়ে দেন।
মেয়েটি বলল, আমার বাবা যা করেছেন তা আমি বহাল রাখলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের এ কথার জানান দেওয়া যে, তাদের ব্যাপারে বাবাদের সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নেই। (মুসনাদে আহমদ: ২৫০৪৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৭৪)
ঘটনা ২এক মেয়ে আল্লাহর রাসুলের (সা.) দরবারে হাজির হয়ে আরজ করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার চাচাতো ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু বাবা তাকে প্রত্যাখ্যান করে, এরপর আমাকে এমন একজনের সাথে বিয়ে দিয়েছে যাকে আমি পছন্দ করি না।
আল্লাহর রাসুল (সা.) তখন তার বাবাকে ডেকে আনেন, এবং তাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি বললেন, আমি তাকে বিয়ে দিয়েছি, এবং তার ভালোটাই ভেবেছি।
তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) মেয়েটিকে বললেন, এই বিয়ে সঠিক হয়নি। তুমি যাও, তোমার পছন্দমতো ছেলেকেই বিয়ে করো। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১৬৭০৩)
ঘটনা ৩এক আনসারি নারীর স্বামী ওহুদ যুদ্ধে স্বামী শহীদ হন। তখন তার গর্ভে সন্তান ছিল। সেই সন্তানের জন্মের পর তার দেবর বিয়ের প্রস্তাব দেন। একই সময়ে অন্য এক লোক তার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। তার বাবা সেই লোকটির সাথেই মেয়ের বিয়ে দেন এবং মেয়ের দেবরকে উপেক্ষা করেন। সেই নারী তখন আল্লাহর রাসুলের (সা.) কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার বাবা আমাকে এমন লোকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন যাকে আমি চাই না, অথচ আমার বাচ্চার চাচাই আমাকে প্রস্তাব করেছিল। এখন যদি এভাবে বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে আমার বাচ্চা আমার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হবে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) তার বাবাকে ডেকে পাঠালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি অমুক মেয়েকে অমুকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছো?
তিনি বললেন: ‘জি, দিয়েছি।’
তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) সেই নারীর উদ্দেশ্যে বললেন, তোমার এই বিয়ে কোনো বিয়ে নয়। তুমি যাও, তোমার সন্তানের চাচাকেই বিয়ে করো। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক: ১০৩০৪)
ঘটনা ৪আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, এক কুমারী মেয়ে আল্লাহর রাসুলের (সা.) কাছে এসে বলল, তার অসম্মতিতে তার বাবা তাকে বিয়ে দিয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) সেই মেয়েকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেন। (সুনানে আবু দাউদ: ২০৯৬)
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার যে, মেয়ে যদি তার পরিবারের সামাজিক মর্যাদার চেয়ে নিম্নস্তরের কোনো পাত্র পছন্দ করে, যাকে বিয়ে করলে তার পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে, তাহলে পরিবার এ রকম বিয়েতে বাধা দিতে পারে। কিন্তু মেয়ে পরিবারের সম সামাজিক মর্যাদার বা উচ্চমর্যাদার পাত্র পছন্দ করলে পরিবারের আপত্তি করা ঠিক নয়।
ওএফএফ