দেশজুড়ে

শেষ সময়েও সেন্টমার্টিনে পর্যটকের জন্য হাহাকার

সেন্টমার্টিন দ্বীপে চলতি পর্যটন মৌসুমে প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক না আসায় পর্যটননির্ভর ব্যবসায় মারাত্মক মন্দা দেখা দিয়েছে। এতে দ্বীপের হোটেল-মোটেল, খাবার হোটেল, ভ্যানচালক, ডাব ও চা বিক্রেতা, শ্রমিক, মাছ ও শুঁটকি ব্যবসায়ীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের বিধিনিষেধ অনুযায়ী এবার মাত্র দুই মাস পর্যটকদের রাতযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে সেই সংখ্যা পূরণ হয়নি। ফলে পুরো মৌসুমজুড়ে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশিত আয় হয়নি।

এদিকে যাতায়াত ব্যবস্থাও পর্যটক কমার একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে ইনানী কিংবা টেকনাফের দমদমিয়া জেটিঘাট ব্যবহার করে পর্যটকরা স্বল্প সময়ে পযর্টকবাহী জাহাজে সেন্টমার্টিন যেতেন। বর্তমানে মিয়ানমার রাখাইনের সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট থেকে জাহাজ চলাচল করায় দীর্ঘ সময় জাহাজে থাকতে অনেক পর্যটক আগ্রহ হারাচ্ছেন।

দ্বীপবাসীরা জানান, জানুয়ারি মাসের পর পর্যটক চলাচল বন্ধ হলে তাদের জীবিকা সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠবে। তারা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ও মানবিক পর্যটন নীতির দাবি জানিয়েছেন।

সেন্টমার্টিনের একটি খাবার হোটেলের মালিক মোহাম্মদ নুর বলেন, আগে পর্যটন মৌসুমে আমাদের হোটেলে সারাদিন রান্না চলত। এবার পর্যটক কম থাকায় তা কমে গেছে, খাবার হোটেলের কর্মচারী ও দোকানের ভাড়া তুলতে কষ্ট হচ্ছে। দোকান চালু রাখাই কষ্টকর হয়ে গেছে।

শুঁটকি দোকানদার শহীদুল ইসলাম বলেন, আগের মৌসুমে দিনে শতাধিক কেজি শুঁটকি বিক্রি হতো। এবার পর্যটক কম থাকায় বিক্রি এতটাই কমে গেছে যে দিনের খরচও মেটানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। কর্মচারীদের পারিশ্রমিক দেওয়া, মাছ সংগ্রহের খরচ, দোকানের রক্ষণাবেক্ষণ সবই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের চাওয়া শুধুই পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি করা, যাতে আমাদের জীবিকা সচল থাকে এবং দ্বীপের পর্যটন শিল্পও এগোতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আর কিছুদিন পর দ্বীপে পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে যাবে। বিগত সময়ের তুলনায় এ মৌসুমে তেমন ব্যবসা হয়নি।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, দ্বীপের বাইরে বিশেষ করে ঢাকাভিত্তিক কিছু হোটেল ও রিসোর্ট মালিক আগে থেকেই পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাহাজভাড়া ও আবাসনসহ প্যাকেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যটক পাঠিয়েছেন। এতে তারা তুলনামূলকভাবে লাভবান হলেও স্থানীয় হোটেল ও রেস্টুরেন্ট মালিকরা তেমন সুবিধা পাননি।

সেন্টমার্টিন হোটেল রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শিবলী আজম কোরেশি বলেন, বিগত বছরগুলোতে সেন্টমার্টিনে প্রায় পুরো মৌসুমজুড়েই পর্যটকের স্বাভাবিক আগমন ছিল, কিন্তু এবার সেই চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। এখন মাত্র দুই মাস পর্যটক আসায় দ্বীপের অনেক হোটেল ও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে।

আবার অনেকেই কর্মচারীদের বেতনসহ দৈনন্দিন ব্যয় কোনোরকমে তুলতে পারবে। পর্যটকের এই ঘাটতির কারণে সেন্টমার্টিনের পর্যটন নির্ভর ব্যবসা ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সেন্টমার্টিনের ডাব বিক্রেতা আলী হোসেন বলেন, আগে পুরো মৌসুমজুড়ে প্রচুর পর্যটক আসত, তখন দিনে শতাধিক ডাব বিক্রি হতো। কিন্তু এবার মাত্র দুই মাস পর্যটক আসার সুযোগ ছিল, এখন সারাদিন বসে থেকেও ১০-১৫টা ডাব বিক্রি করতে পারছি না। ডাব কিনে আনা, পরিবহন খরচ সব মিলিয়ে আয়তো দূরের কথা, খরচই ঠিকমতো উঠছে না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।

সেন্টমার্টিন জেটিঘাটের এক শ্রমিক নোমান বলেন, আগে প্রতিদিন জাহাজ এলে কাজের চাপ থাকত, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটত। তখন যা আয় হতো, তা দিয়েই পরিবার চালানো যেত। কিন্তু এখন পর্যটক কম আসায় জাহাজও কম আসে, কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক দিন কোনো আয়ই হয় না। সংসারের খরচ চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটক কম হওয়ায় দ্বীপের মানুষের আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আমরা চাই পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়া হোক। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা এবং স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুললে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’

পর্যটক কমার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে যাতায়াত ভোগান্তির কথাও উঠে এসেছে। ঢাকার পর্যটক মাহবুব হাসান বলেন, ‘নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট থেকে জাহাজে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়েছে। সাগরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো অনেকের জন্য কষ্টকর। এক্ষেত্রে ছোট বাচ্চা ও বয়স্কদের বেশি ভোগান্তিতে পোহাতে হয়।’

এসব বিষয়ে টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য পর্যটক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা দ্বীপবাসীর কষ্ট বুঝি, তবে স্থানীয় জনগণের জীবিকা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বিকল্প ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে কাজ করছি।

জাহাঙ্গীর আলম/এফএ/জেআইএম