অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বকালীন সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সংস্কার, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, ডিজিটালাইজেশন এবং করের আওতা সম্প্রসারণে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য গতি এসেছে এবং কর ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায় এনবিআর।
সংস্থাটি বলছে, রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পৃথক করার লক্ষ্যে সরকার ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে। প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল ইমপ্লেমেন্টেনশন কমিটি ফর এডমেনিস্ট্রেটিভ রিফর্মের (নিকার) সভায় রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের রুলস অব বিজনেস এবং এবং অ্যালোকেশন অব বিজনেস সংশোধনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কারে এ সিদ্ধান্তকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কার্যকর মনিটরিং, কর ফাঁকি রোধ এবং পূর্বে ফাঁকি দেওয়া কর পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য গতি এসেছে। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এনবিআর মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ২০ কোটি টাকা বেশি।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রামে বিশ্বমানের অত্যাধুনিক কাস্টমস হাউস ও কাস্টমস একাডেমি নির্মাণে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে চট্টগ্রামে আধুনিক কর ভবন নির্মাণের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। খুলনা কর ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, যা আগামী ২৯ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হবে।
এনবিআরের জন্য ১০ বছর মেয়াদি মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যা সম্পূর্ণ কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর অব্যাহতি সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে টিইপিএমএফ প্রণয়ন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। আয়কর আইন, কাস্টমস আইন ও ভ্যাট আইন সংশোধনের মাধ্যমে এনবিআরের কর অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর অব্যাহতি দেওয়া যাবে না।
আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট আইনের ইংরেজি আকারে সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং আইন প্রয়োগে অস্পষ্টতা দূর হবে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৩ হাজার ৫০০ জনকে আইটিপি (আয়কর আইনজীবী) সনদ দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো এ পরীক্ষায় আয়কর পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আমদানি-রপ্তানিতে শুল্ক ও করে চালানের মাধ্যমে অনলাইনে সরাসরি ট্রেজারিতে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
এসাইকুডা ওয়ার্লস ও আইবাস প্লাস প্লাস ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে ব্যাংক ও এমএফএস (বিকাশসহ) ব্যবহার করে কোনো ফি ছাড়াই কর পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে। প্রতি মাসে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সমস্যা সরাসরি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনসিএসএ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী এনবিআরে সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার চালু করা হয়েছে, যা সার্বক্ষণিক সাইবার হুমকি পর্যবেক্ষণ করছে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের হজযাত্রীদের বিমান টিকিটে আবগারি শুল্ক অব্যাহতি, মেট্রোরেল সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি (৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত), রমজানে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ৪০ শতাংশ ও অগ্রিম আয়কর ৫০ শতাংশ হ্রাস, চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম, চিনি, তাজা ফল ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যে কর ও শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানিকৃত ৩১টি গাড়ি যথাসময়ে খালাস না হওয়ায় সরকারের কাছে হস্তান্তর, প্রতি বছর একবার যাত্রীদের জন্য একটি নতুন মোবাইল ফোন শুল্কমুক্ত আনার সুযোগ, মোবাইল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ এবং যন্ত্রাংশে ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ কমানো হয়েছে।
ভ্যাট খাতে নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—ই-ভ্যাট, অনলাইন রিটার্ন, স্মার্ট চালান বিশেষ ক্যাম্পেইনে ১.৩১ লাখ নতুন ভ্যাট নিবন্ধন, ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৫.১৬ লাখ থেকে বেড়ে ৭.৭৫ লাখ ও অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড মডিউল চালু ইত্যাদি।
আয়কর ব্যবস্থার সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, ৩৪ লাখের বেশি ই-রিটার্ন, প্রবাসীদের জন্য ই-মেইলভিত্তিক ওটিপি, আমদানিতে পরিশোধিত অগ্রিম আয়করের স্বয়ংক্রিয় ক্রেডিট চালু, রিক্স বেইজড অডিট ও স্পট এসেসমেন্ট চালু।
কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো, সিবিএমএস, ট্র্যাক মুভমেন্ট মডিউল, নতুন শিপিং এজেন্ট ও সিএন্ডএফ লাইসেন্সিং বিধিমালা, চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জট কমাতে বিশেষ অভিযান ইত্যাদি করা হয়েছে।
এনবিআর জানায়, নীতিগত সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি দৃশ্যমান ও টেকসই পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এসএম/এমকেআর