মতামত

রাষ্ট্রের যে অমানবিক চেহারাটি আমরা আর দেখতে চাই না

স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি মেলেনি। কারা ফটকের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে তাদের নিথর দেহ দেখলেন জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে যশোর জেলা কারাগারে আছেন নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি সাদ্দাম।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার দুপুরে সাদ্দামের স্ত্রী ও ছেলের মরদেহ সাবেকডাঙ্গা গ্রামে নেয়া হয়। সেখানে গোসল শেষে বিকাল সোয়া চারটার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় তাদের মরদেহ। সেখানে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন সাদ্দাম। সন্তানের জন্মের আগে থেকেই তিনি কারাগারে আছেন।

সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণার ভাই মো. শুভ সাংবাদিকদের বলেন, স্বামী কারাবন্দী থাকায় অনেকটাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন সুবর্ণা। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রথমে সন্তানকে হত্যার পরে আত্মহত্যা করেছেন সাদ্দামের স্ত্রী। তবে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া তাদের মৃত্যুরহস্য জানা যাবে না।

একজন অপরাধী যত বড়ই হোন না কেন; এমনকি তিনি যদি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও হন, তারপরও স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পরে তার প্যারোলে মুক্তি পাওয়াটা শুধু আইনের দৃষ্টিতে নয়, মানবিক দৃষ্টিতেও যৌক্তিক। কিন্তু সাদ্দামের সেই সৌভাগ্য হয়নি। তার পরিবার প্যারোলের লিখিত আবেদন করেছিল কি না, তা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই প্যারোলের আবেদন জানিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত একটি আবেদনের নমুনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে। যদি এটা সত্যি হয় তাহলে এর জন্য কারা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, যদি স্বামীর কারাগারে থাকার কারণে হতাশা থেকে নিজের সন্তানকে হত্যার পরে সুবর্ণা আত্মহত্যা করে থাকেন, তাহলে এই দুটি মৃত্যুর দায়ও রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। কারণ সাদ্দাম যদি অপরাধী হয়ে থাকেন, প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। কিন্তু তার অপরাধের দায় কোনোভাবেই তার স্ত্রী ও সন্তানের নয়।

বিগত সরকাররে আমলেও এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারাগারে আটকে থাকা; প্রিয়জনের মৃত্যুর পরে প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া; হাতকড়া পরা অবস্থায় জানাজায় অংশগ্রহণের অসংখ্য নজির আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের সেই অমানবিক চেহারাটা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও কেন দেখতে হবে—যে সরকারের প্রধান শান্তিতে নোবেলজয়ী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ, এটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে যে প্রতিহিংসা প্রতিপক্ষ নির্মূলের রাজনীতি চলছে, সেই লিগ্যাসি থেকে অন্তর্বর্তী সরকারও বের হতে পারলো না। অথচ গত বছর ধরে সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কারাগার ও বিচার ব্যবস্থায় কী সংস্কার হলো; প্রতিপক্ষ নির্মূলের রাজনীতির অবসানে এই সরকার কী উদ্যোগ নিলো—তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই। বরং পুরোনো পদ্ধতিতেই নতুন বন্দোবস্ত কায়েম হয়েছে। আগে একদল লোক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতো, এখন তাদের সরিয়ে আরেকটি পক্ষ একইভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।

যেসব কারণে আওয়ামী লীগ তথা হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে; যেসব কারণে ওই সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হয়েছে—সেখানে এইধরনের বিচারহীনতা ও বিচারের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দায়ও অনেক। লেখক মুশতাককে জেলখানায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। চব্বিশের কোটা সংস্কার আন্দোলনটি যে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলো, সেখানে লেখক মুশতাককে হত্যার মতো ঘটনাগুলোরও ভূমিকা কম নয়। অথচ এই সরকারের আমলেও একইভাবে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুর খবর মিলছে। তাদের কতজন সত্যিই অসুস্থতাজনিতক কারণে মারা গেছেন আর কতজন নির্যাতনে—সেটি নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া জানা সম্ভব নয়। কেউ যদি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন বা কারো যদি বড় ধরনের অুসখ থাকে, তার চিকিৎসা করানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার যেমন এই দায়িত্বটি পালন করেনি, তেমনি শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের সরকারও করছে না। ফলে এই দুটি সরকারের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

গত দেড় বছর ধরে অনেক সাংবাদিক হত্যা মামলায় কারাগারে। বাস্তবতা হলো, তাদের কারো বিরুদ্ধেই হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের কাছ থেকে নানাবিধ সুবিধা নেয়ার অভিযোগ আছে। হয়তো এর অনেক প্রমাণও আছে। কিন্তু সেসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অর্থই হলো যাতে তাদের জামিন না হয়। যাতে বিনা বিচারে তাদরেকে মাসের পর মাস জেলখানায় রাখা যায়। অর্থাৎ আদালতে বিচারের আগেই শারীরিক ও মানসিকভাবে মেরে ফেলার একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা যাচ্ছেন।

শোনা যায়, এই সাংবাদিকদের কেউ কেউ আগে থেকেই জটিল রোগে ভুগছেন। স্বভাবতই কারাগারে থাকা অবস্থায় তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা হয় না। সুতরাং বিনা চিকিৎসায় বা পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে যদি কারাগারে কোনো সাংবাদিকের মৃত্যু হয়, তাহলে দেশে বিদেশে তার যে প্রতিক্রিয়া হবে, সরকার সেটি কীভাবে সামাল দেবে? নাকি তারা কোনো কিছুই পাত্তা দিতে রাজি নয়?

দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী না হলে বা যিনি জামিনে মুক্ত হয়ে বড় ধরনের নাশকতা করতে পারেন বলে আশঙ্কা আছে, এমন লোক না হলে যেকোনো অপরাধীর জামিন পাওয়ার কথা। কিন্তু বারবার এই সাংবাদিকদের জামিন নাকচ হচ্ছে? তারা কি দুর্ধ্ষ সন্ত্রাসী যে জেল থেকে বের হয়েই তারা শত শত মানুষ মেরে ফেলবেন? খুন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় যারা মাসের পর মাস জেলখানায় আছেন, তারা কেউ খুন ও সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত—এটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?

সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে টেলিভিশনের টকশোতে সরকারের সমালোচনার কারণে। পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায়। টেলিভিশনের টকশোতে বা পত্রিকার কলামে সরকারের সমালোচনা কি সন্ত্রাসী কাজ? মানুষের সমালোচনার অধিকার থাকবে না? যারা মিছিলের স্লোগানে অশ্লীল বাক্য বলেন; যারা কথায় কথায় যাকে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন; গত দেড় বছর ধরে যারা মবসন্ত্রাস করে মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছে—তাদের কতজনকে সরকার গ্রেপ্তার করেছে? একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার যে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছে বা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পকেটের ভেতরে ঢুকে গেলো—সেটি অত্যন্ত বেদনার।

বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে যে প্রতিহিংসা প্রতিপক্ষ নির্মূলের রাজনীতি চলছে, সেই লিগ্যাসি থেকে অন্তর্বর্তী সরকারও বের হতে পারলো না। অথচ গত বছর ধরে সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কারাগার ও বিচার ব্যবস্থায় কী সংস্কার হলো; প্রতিপক্ষ নির্মূলের রাজনীতির অবসানে এই সরকার কী উদ্যোগ নিলো—তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই। বরং পুরোনো পদ্ধতিতেই নতুন বন্দোবস্ত কায়েম হয়েছে। আগে একদল লোক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতো, এখন তাদের সরিয়ে আরেকটি পক্ষ একইভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ৬ মাস পরে জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধানী দলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এতে বলা হয়েছে, চব্বিশের আগস্টের শুরু থেকে পরবর্তী সময়ে সহিংস মব (বিশৃঙ্খল জনতা) পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিশানা করে হত্যাসহ গুরুতর প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড করেছে। এ সময় হিন্দু, আহমদিয়া মুসলিম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। তাদের বাড়িঘরে হামলা ও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলা হয়েছে মাজার, মন্দিরসহ ধর্মীয় স্থাপনায়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন ব্যক্তিদের এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ভুক্তভোগীদের মানবাধিকার রক্ষা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকারের প্রতি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে অন্যের দ্বারা গুরুতর নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির জানমালের নিরাপত্তা দিতে হবে। একই সঙ্গে যথাযথ নিয়ম মেনে দ্রুততার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে আওয়ামী লীগ–সমর্থক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর হামলার তদন্ত করতে হবে। যদিও এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতের লক্ষ্যে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছিল, সেগুলো সরবরাহ করা হয়নি। (প্রথম আলো, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।

সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪৫ জন। অথচ এই সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে। জনগণেরও প্রত্যাশাও ছিলো তাই। কিন্তু কোথাও কোনো পরিবর্তন হয়নি। উপরন্তু সরকার এসব ঘটনায় কী ব্যবস্থা নিয়েছে তাও দৃশ্যমান নয়।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কুমিল্লায় যৌথবাহিনীর হেফাজতে যুবদল নেতা তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়৷ ওই ঘটনায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প কমান্ডারকে প্রত্যাহার ও সেনা আইনে ব্যবস্থার কথা বলা হয় তখন। কিন্তু তৌহিদুল ইসলামের ভাই আবুল কালাম সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা পাঁচজনের নামসহ অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার বা কোনো ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা থানায় যোগাযোগ করলে বলা হয় তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। কিন্তু তারা আসলে আদৌ কোনো তদন্ত করছে কী না তাই এখন প্রশ্ন।

একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য যে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলো, তাদের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে যে সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং যার অংশ হিসেবে সংবিধান, নির্বাচন, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি ও আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, সেই ধারাবাহিকতায় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও সংস্কার আসবে; নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানকারী বাহিনীগুলোর সদস্যরা মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার থাকবেন; দল-মত-বয়স ও লিঙ্গনির্বিশেষে তারা সকল নাগরিকের প্রতি সংবেদনশীল থাকবেন এমনকি অপরাধীর মানবাধিকারের প্রতিও খেয়াল রাখবেন—এটিই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু কোনো প্রত্যাশাই গত দেড় বছরে সরকার পূরণ করতে পেরেছে—সেটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না। বরং যেসব কারণে বিগত সরকারের ওপর মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, এই সরকারে ওপরেও মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি তার চেয়ে কম নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/জেআইএম