আন্তর্জাতিক

আসন্ন চরম তাপপ্রবাহের জন্য বিশ্ব প্রস্তুত নয়: বিজ্ঞানীদের সতর্কতা

আসন্ন চরম তাপপ্রবাহের জন্য বিশ্ব প্রস্তুত নয় বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা আরও জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৮০ কোটি মানুষ চরম তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারে।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলো, তবে তুলনামূলক শীতল অঞ্চলগুলোকেও এখন থেকেই মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ার মতো বড় দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা তাপ মোকাবিলার ব্যবস্থা না থাকা কোটি কোটি মানুষের জন্য শীতলীকরণের চাহিদা ‘ব্যাপকভাবে’ বাড়বে। এসব দেশে ভবিষ্যতে তীব্র গরম সামাল দিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন আরও তীব্র আকার নেবে।

অন্যদিকে, তুলনামূলক শীতল দেশ যেমন কানাডা, রাশিয়া ও ফিনল্যান্ডেও গরম দিনের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও তার প্রভাব হবে ‘গুরুতর’। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব দেশ এমন তাপমাত্রার সঙ্গে অভ্যস্ত নয়, ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

নতুন এই গবেষণায় বিভিন্ন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে মানুষ কত ঘন ঘন অস্বস্তিকর গরম বা ঠান্ডা তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারে, তার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা গেছে, শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে চরম তাপের অভিজ্ঞতা পাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

গবেষণার প্রধান লেখক ও পরিবেশবিজ্ঞানী জেসুস লিজানা এএফপিকে বলেন, এর বড় অংশের প্রভাব পড়বে চলতি দশকেই, কারণ বিশ্ব দ্রুতই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই গবেষণার মূল বার্তা হলো- চরম তাপের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয়তা আমরা আগে যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি।

লিজানার মতে, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই টেকসই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা প্রাকৃতিক উপায়ে শীতলীকরণের মতো নতুন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘ সময় চরম তাপের সংস্পর্শে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এতে মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা থেকে শুরু করে অঙ্গ বিকল ও মৃত্যুও হতে পারে। এ কারণেই তাপজনিত মৃত্যু অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে পরিচিত, কারণ উচ্চ তাপমাত্রা ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণে ধীরে ধীরে শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন শীতলীকরণ ব্যবস্থা মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে উঠবে।

ভয়ংকরভাবে অপ্রস্তুত বিভিন্ন দেশ

নেচার সাসটেইনেবিলিটি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ চরম তাপের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শীতলীকরণের জন্য জ্বালানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে এবং সেখানেই স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা দেবে। ভারত, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ‘কুলিং ডিগ্রি ডে’- অর্থাৎ যে তাপমাত্রায় শীতলীকরণ প্রয়োজন, তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে উষ্ণমণ্ডলীয় ও বিষুবীয় দেশগুলোতে, বিশেষ করে আফ্রিকায়। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস ও ব্রাজিলে বিপজ্জনকভাবে গরম দিনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়বে।

গবেষণার সহলেখক ও নগর জলবায়ু বিশেষজ্ঞ রাধিকা খোসলাও এএফপিকে বলেন, সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষরাই এই ক্রমবর্ধমান গরম দিনের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করবে। আমাদের গবেষণা এমনটিই দেখিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে শীতল জলবায়ুর ধনী দেশগুলোরও বড় সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে, যদিও এখনো অনেকেই বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না।

২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার পরিস্থিতিতে কানাডা, রাশিয়া ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশে ‘হিটিং ডিগ্রি ডে’- অর্থাৎ ঘর গরম রাখার প্রয়োজনীয় ঠান্ডা দিনের সংখ্যা কমে যেতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব দেশে সামান্য গরম বাড়লেও তার প্রভাব হবে অনেক বেশি, কারণ সেখানকার ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো সাধারণত সূর্যের আলো ধরে রাখা ও বায়ু চলাচল কমানোর মতো করে নির্মিত, আর গণপরিবহনেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা খুব একটা নেই।

লিজানা বলেন, কিছু শীতপ্রধান দেশে সাময়িকভাবে গরম রাখার খরচ কমতে পারে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাশ্রয় শীতলীকরণের বাড়তি খরচে রূপ নেবে। ইউরোপের অনেক দেশেই এখনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিরল।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ধনী দেশগুলো বসে থেকে ভাবতে পারে না যে তারা ঠিক থাকবে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা আগামী কয়েক বছরে আসা তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় ভয়ংকরভাবে অপ্রস্তুত।

সূত্র: এএফপি

এসএএইচ