জাতীয়

অগণতান্ত্রিক শাসন পরিবর্তনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান আলী রীয়াজের

দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণকে রায় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) আলী রীয়াজ।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে এই সভার আয়োজন করে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংস্থা হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট।

আলী রীয়াজ জানান, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ৩৬ দিন ধরে দেশজুড়ে যে গণআন্দোলন হয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক দল, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়; বরং একটি মাত্র লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তা হলো বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার অবসান।

তিনি বলেন, ‘টানা ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে একজন ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকার ফলে নাগরিকদের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার পর্যন্ত ক্ষুণ্ন হয়েছে। মানুষ ভোট দিতে পারেনি। একাধিক জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধান নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।’

বিদ্যমান ব্যবস্থার সমালোচনা করে আলী রীয়াজ জানান, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী একক সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, এমনকি বিচার বিভাগকেও প্রভাবিত করতে পারেন। নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কাগুজে হলেও বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বাধ্যতামূলক, যা ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণের উদাহরণ।

তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রক্রিয়া তুলে ধরে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংসদীয় কমিটির ২৫টি বৈঠক ও ১০৪ বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামতের বিপরীতে শুধু শেখ হাসিনার একক ইচ্ছায় পুরো সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে জনগণের ভোটাধিকার বাতিল হয়।’

আলী রীয়াজ জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদে বেশ কিছু মৌলিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি কর্ম কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয়, বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ এবং উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপনের প্রস্তাবও জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাতে জনগণের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ হয়।

রাষ্ট্রের মূলনীতি বদলের অপপ্রচারের জবাবে আলী রীয়াজ জানান, জুলাই জাতীয় সনদে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিলের কথা নয়; বরং সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতিকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে সুস্পষ্ট করার প্রস্তাব রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ একটি বহু জাতিগোষ্ঠী, বহু ধর্ম, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। এই বাস্তবতাকে সংবিধানে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। একই সঙ্গে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বহাল রেখে অন্যান্য মাতৃভাষাকেও দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আলী রীয়াজ বলেন, ‘এসব সংস্কার বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হলো গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয়। যারা ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা হলো- এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বিদ্যমান সংবিধানের সমালোচনা করে বলেন, ‘এই সংবিধান বহাল থাকলে যে কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে বাধ্য। ক্ষমতায় যে যাবে সে ১৫-২০ বছর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেয়ে যাবে। সে আমার বাবা হতে পারে অথবা আপনার বাবা হতে পারে। সে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবেই। তাই এই সংবিধান সংস্কার প্রয়োজন।’

এফএআর/একিউএফ