ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আরেকটি হামলা হবে ‘অস্তিত্বের লড়াই’- এমনই মন্তব্য করেছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হোসেন মুসাভিয়ান। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) এই শিরোনামে তার লেখা একটি নিবন্ধ ছাপা হয় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ে।
নিবন্ধে লেখা হয়, সম্প্রতি ইরান এমন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যা দেশটি গত কয়েক দশকে দেখেনি। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে তেহরান এখন এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে, যার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও পড়তে পারে।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চারপাশে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ গড়ে তুলেছে। অতিরিক্ত নৌবহর, যুদ্ধবিমান ও সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের আশপাশে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় সামরিক উপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবেই এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে এবং তেহরান থেকে এ নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তাও এসেছে।
নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ কৌশল অনুসরণ করছেন।
গত বছরের জুনে ‘টপ-ডাউন সরকার পতন, বটম-আপ গণঅভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত এক কৌশলের ভিত্তিতে একটি নাটকীয় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ইসরায়েলি ও মার্কিন পরিকল্পনাকারীরা ধারণা করেছিলেন, ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও পারমাণবিক কর্মকর্তাদের হত্যার মাধ্যমে জনগণ রেজিম পরিবর্তনের পক্ষে রাস্তায় নেমে আসবে।
তাদের আরও ধারণা ছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা গেলে কোনো পাল্টা হামলা হবে না ও দ্রুত সরকার ভেঙে পড়বে। জুনের ওই হামলায় ইরানের বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। কিন্তু প্রত্যাশার বিপরীতে, জনগণের বড় অংশ সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা ছিল উল্লেখযোগ্য পাল্টা আঘাত। বিশ্লেষকেরা এখন একমত যে, এই দুটি বিষয়ই ২০২৫ সালের ওই অভিযানের ব্যর্থতার মূল কারণ।
এরপর ট্রাম্প ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন, যার ফলে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এরপর একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করা।
তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে অর্থনৈতিক অসন্তোষ নতুন করে বিক্ষোভের জন্ম দেয়। তেহরানে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে আসেন মুদ্রা রিয়ালের ধস ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে। এই বিক্ষোভ দ্রুত অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভ ‘হাইজ্যাকের’ চেষ্টা
এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘প্ল্যান বি’ বাস্তবায়নের সুযোগ পায় বলে মনে করা হয়। যার কৌশলকে সংক্ষেপে বলা যায়- ‘বটম-আপ গণঅভ্যুত্থান, টপ-ডাউন সামরিক হামলা’।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল-সম্পৃক্ত নেটওয়ার্কগুলো বিক্ষোভের ভেতরে ঢুকে নাশকতা, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়ায়, যাতে সংঘর্ষ বাড়ে এবং হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা তৈরি করতে পারে। এই দফায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে হতাহতের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিক্ষোভ ‘হাইজ্যাকের’ কৌশল ব্যর্থ হয়। সহিংস অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হলে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে সরকার-আয়োজিত এক সমাবেশে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেয়, যা বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতার স্পষ্ট বার্তা দেয়।
ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দেয়, বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ থেকে পিছু হটে।
এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরবর্তী সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে সরানোর চেষ্টা, যা সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা অভিযানের সঙ্গে তুলনা টানছে অনেকেই।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, এখন সময় এসেছে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সরানোর। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম ইরানি শাসনব্যবস্থাকে নাৎসিদের সঙ্গে তুলনা করে এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, আমরা এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত হাতছাড়া করতে পারি না। আয়াতুল্লাহ ও তার শাসনের পতন হবে বার্লিন দেয়াল পতনের সমতুল্য।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এ ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, আমাদের মহান নেতার ওপর হামলা মানে ইরানি জাতির বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কট্টরপন্থি ইসরায়েল সমর্থকরা প্রস্তাব দিয়েছেন, পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের বদলে ট্রাম্প যেন ১৯৭৯ সালে অ্যাডমিরাল জেমস ‘এইস’ লায়ন্সের দেওয়া একটি পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করেন। ওই পরিকল্পনায় ইরানের খার্গ তেল টার্মিনাল দখলের কথা বলা হয়েছিল, যেখান থেকে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। এতে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রেজিম পরিবর্তনে বাধ্য করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি
আগামী দিন ও মাসগুলোতে ইরানের গতিপথ নির্ধারণ করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমটি হলো- অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক সংহতি। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও গভীর সামাজিক বিভাজনই জনঅসন্তোষের প্রধান উৎস।
বর্তমানে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও, চাপা অসন্তোষ আবারও বড় আকারের বিক্ষোভে রূপ নিতে পারে। রক্ষণশীল, সংস্কারপন্থি, মধ্যপন্থি ও জাতীয়তাবাদী- এই চার প্রধান রাজনৈতিক ধারার মধ্যে বিভাজন জাতীয় ঐক্যকে জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাপক সংস্কার ও ঐক্য জরুরি।
ইরানের জনগণ লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ আর সহ্য করতে পারছে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কীভাবে শাসকগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিয়ে মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে।
এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারির অস্থিরতায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হওয়ায় অসংখ্য পরিবার শোকে মুহ্যমান। এটি ইরানি সমাজের মানসিক অবস্থার ওপর গভীর আঘাত হেনেছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রেজিম পরিবর্তনের চাপ। উভয় দেশের অব্যাহত শত্রুতা ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর নজিরবিহীন বাহ্যিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তেহরানে রেজিম পরিবর্তনের জন্য ট্রাম্পের প্রকাশ্য আহ্বান কয়েক দশকের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক উত্তেজনা তৈরি করেছে।
এই চাপ শুধু ইরানের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে। ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সম্মানজনক কোনো সমঝোতায় যাবেন, নাকি ‘আত্মসমর্পণ না যুদ্ধ’ নীতিতেই অটল থাকবেন- তা এখনো অনিশ্চিত।
তৃতীয় বিষয়টি হলো- অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ভূমিকা। সৌদি আরব, মিশর, ওমান ও কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ আরব দেশগুলো ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। তারা আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ধারণা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এই যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলো কি আরেকটি যুদ্ধ ঠেকাতে পারবে ও ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতার পথ তৈরি করবে, নাকি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই জয়ী হবে- তা সময়ই বলে দেবে।
সামনে পথ কোন দিকে
চতুর্থ বিষয় হিসেবে, এই প্রেক্ষাপটে ইরান রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন ও ব্রিকসে যোগ দিয়ে তেহরান পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে।
এই অবস্থান অঞ্চলটির ভবিষ্যতের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে ও ইরানের ‘পূর্বমুখী নীতি’র জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সবশেষে, ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বলে পরিচিত ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র প্রকাশ্যে সতর্ক করে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে তারা বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতৃত্ব জানিয়েছে, তারা নিরপেক্ষ থাকবে না। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি সরকার লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর আবার হামলা শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরাকের কাতায়েব হিজবুল্লাহ আধাসামরিক গোষ্ঠীও ইরানে হামলার জবাবে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ’ হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এর অর্থ হলো, আগের সংঘাতগুলোর মতো এবার ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না। বরং ইরানে হামলা হলে ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিভিন্ন অংশ সক্রিয় হয়ে একটি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করবে।
কিছু মার্কিন ও ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ট্রাম্প এরই মধ্যে ইরানে নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এ মুহূর্তটিকে তারা বর্ণনা করছেন একটি ‘রক্তাক্ত বিরতি’ হিসেবে, যার পরেই হতে পারে ‘আঞ্চলিক বিস্ফোরণ’। ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আরেকটি হামলা হবে ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’। এতে সংযমের কোনো প্রণোদনাই থাকবে না ও এমন সংঘাত শুরু হবে, যা আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না।
এই বিপর্যয় এড়াতে হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘আত্মসমর্পণনির্ভর কৌশল’ থেকে সরে এসে ইরানের সঙ্গে একটি বিস্তৃত, সম্মানজনক সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে, যাতে ৪৭ বছরের সংঘাতের অবসান ঘটে ও অঞ্চলটি অপরিবর্তনীয় যুদ্ধের দিকে না ধাবিত হয়।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এসএএইচ