দেশজুড়ে

উত্তাপ বাড়ছে ভোটের মাঠে, প্রচারণায় বাধাসহ পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার শুরুতেই প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তাপ ছড়াচ্ছে পাবনার ভোটের মাঠে। পাবনা ১ ও ২ আসনে সীমানা জটিলতায় ভোটের কার্যক্রম পিছিয়ে যাওয়ায় সদ্য শুরু হয় প্রচারণা। তবে প্রচারণার শুরুতেই পাবনা ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা ও ছেলেকে মারধরের অভিযোগ, পাবনা ৪ ও ৫ আসনে ভোটারদের বিব্রত করা, নেতাকর্মীদের হুমকি ও প্রচারণায় বাধার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ প্রার্থীদের। স্থানীয়দের আশঙ্কা প্রার্থী সমর্থকদের কথার লড়াই সহিংসতায় গড়ালে নির্বাচনি পরিবেশ ব্যাহত হতে পারে।

রিটার্নিং অফিসার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, তফসিল অনুযায়ী গত ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ পান পাবনা ৩, ৪ ও ৫ আসনের প্রার্থীরা। এদিন থেকেই অনেকেই প্রচারণা শুরু করলেও আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয় ২২ জানুয়ারি। অন্যদিকে পাবনা ১ ও ২ আসনে ২৭ জানুয়ারি প্রতীক বরােেদ্দর পর শুরু হয়েছে প্রচারণা।

অভিযোগ রয়েছে, প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনেই চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা নিয়ে পাবনা ৩ আসনে ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী কেএম আনোয়ারুল ইসলামের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়। এ নিয়ে থানায় একটি জিডিও করা হয়। এরপর ২৪ জানুয়ারি কর্মী সমর্থকদের নিয়ে বিকেলে ফৈলজানা বাজার এলাকায় ঘোড়া প্রতীকের লিফলেট বিতরণ করতে যান প্রার্থীর বড় ছেলে কে এম মনোয়ারুল ইসলাম শাফি। এ সময় ধানের শীষ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীর কোনো প্রচার চলবে না জানিয়ে এলাকার ইউপি সদস্য লোকমান হোসেন ও যুবদল নেতা মামুনের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তি তাদের প্রচার ও লিফলেট বিতরণে বাধা দেন। এক পর্যায়ে শাফিকে মারধর ও মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা হয়।

স্বতন্ত্র প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলামের পক্ষে তার ছোট ছেলে মো. কাফি বলেন, প্রচারণা শুরুর দিনে ধানের শীষের প্রার্থীর লোকজন আমাদের মাইক ভাঙচুর করেছে। এরপর আমার ভাইকে মেরেছে। এখন ভাবুন আমাদের কর্মী সমর্থকদের অবস্থা কেমন। প্রতিটি ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কর্মী সমর্থকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। শুরুর দিকেই যদি এরকম হয় তবে ভবিষ্যত পরিবেশ কেমন হবে সেটা অনুমেয়। আমরা নির্বাচনি সুন্দর পরিবেশ চাই। না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিভাবে।

ধানের শীষের প্রার্থী হাসান জাফিরের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তার পক্ষে তার বক্তিগত সহকারী শামসুর রহমান শামস বলেন, মাইক ভাঙচুর ও একজনকে বাধা দেওয়ার বিষয়টি আমরা শুনেছি। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তারা আমাদের কর্মীও না। আমরা কোনো সহিংসতা চাই না। এব্যাপারে প্রার্থী তুহিন নেতাকর্মীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে শামস বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা ধানের শীষের প্রার্থীকে নিয়ে অশালীন ভাষায় কটূক্তি করছেন। ঘোড়া প্রতীকে নির্বাচন করেও নিজেকে বিএনপির প্রার্থী দাবি করে ভোটারদের বিব্রত করছেন। এসব নিয়ে অনেকেই স্ব-প্রণোদিত হয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে অনেক সময় দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে।

সদর বা পাবনা-৫ আসনে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। এখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ও বিএনপি প্রার্থী। এখানেও দেখা গেছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) পাবনা সদর উপজেলার বুদের হাট এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা ও ভোট চাওয়া নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।

জামায়াত মনোনীত প্রার্থী প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন বলেন, সদর উপজেলার পৌর ১৫ ওয়ার্ড এলাকায় আমাদের নারীকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইছিলেন। এসময় স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি কর্মী তাদের প্রচারণায় বাধা দিয়ে লাঞ্ছিত করে। তারা আমাদের নারীকর্মীদের গায়েও হাত তুলেছেন। এ সময় আমাদের দলের দায়িত্বশীল সুলতান তাদের রক্ষার চেষ্টা করলে তাকেও মারধর করা হয়েছে। প্রশাসন তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করবে বলে আমি আশা করি।

এদিকে এ ব্যাপারে বিএনপি প্রার্থী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার নির্বাচন সমন্বয়কারী জেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক জহুরুল ইসলাম পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে তার নারীকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহবধুদের কাছ থেকে কৌশলে ভোটার আইডি নম্বর ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছিল। ভোটের বিনিময়ে নানা প্রলোভন দেখানোয় এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়। তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্থানীয়রা জেরা করলে তারা চিৎকার চেচামেচি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে এবং জামায়াতের প্রার্থীসহ কর্মীদের এনে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করে। এভাবেই ভোটারদের বিব্রত ও নির্বাচনি পরিবেশ নষ্টের চেষ্টা করা হচ্ছে।

অভিযোগের উত্তাপ রয়েছে ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া নিয়ে গঠিত পাবনা ৪ আসনেও। আসনটিতে জামায়াত, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একে অপরের বিরুদ্ধে রয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

গত ২৭ নভেম্বর ঈশ্বরদীর চরগড়গড়িতে নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এসময় গোলাগুলিসহ পুরো ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। এ অভিযোগ এখনো চলমান। এছাড়া প্রচারণায় বাধা দেওয়াসহ বিএনপি প্রার্থী ও তার কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন মোটরসাইকেল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টু। গত ২৩ জানুয়ারি ফেইসবুক লাইভে এসে ধানের শীষের কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে তার প্রচারণায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টু বলেন, দলীয় প্রার্থী হাবিব অত্যন্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ। সম্প্রতি একটি ছেলে তার লিফলেট নেয়নি। এ জন্য তার লোকেরা ছেলেটির ওপর আক্রমণ করে। মুলাডুলি রোডে আমার প্রচারণা মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমার বিজয় নিশ্চিত জেনে দলীয় প্রার্থী হাবিব পাগল হয়ে গেছে। এতোবড় নেতা হয়েও তিনি নিজে ফেসবুক লাইভে এসে আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। এগুলো নির্বাচনি পরিবেশ নষ্টের অপচেষ্টা।

পাবনা ৪ আসনের জামায়াত প্রার্থী আবু তালেব মন্ডল বলেন, ২৭ নভেম্বরে আমাদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। এছাড়া কিভাবে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেও সেটা দেখে নেওয়া হবে- এসব বলে ক্রমাগত ধানের শীষের পক্ষে দাঁড়িপাল্লার কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে ভোটার সমর্থকদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছে।

পাল্টা অভিযোগ করে বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, আচরণবিধি ভঙ্গ হয় এমন কোনো কাজ আমার লোকজন করেছে বলে আমার জানা নেই। উল্টো আমার কর্মীদের হেনস্তা করা হচ্ছে। শনিবার ঈশ্বরদী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে আমাদের মেয়েরা প্রচারণায় গেলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকেরা তাদের হেনস্তা করে। এদেরই লোক মাস্ক পড়ে রেললাইনের পাশে আমার ব্যানার ছিঁড়েছে। আমার ব্যানারের ওপরে মোটরসাইকেলের ব্যানার লাগানোসহ নানাভাবে আমার নির্বাচনি কার্যক্রম ব্যাহত করা হচ্ছে। প্রচারণা শুরুর পর জামায়াতের লোকজনের সঙ্গে আমাদের তেমন ঝামেলা নজরে আসেনি।

পাবনা জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা বলেন, শৃঙ্খলা রক্ষায় আসনগুলোতে ম্যাজিস্টেট নিয়োগ ও আর্মি টহল জোরদার করা হয়েছে। একটি নির্বাচন মনিটরিং টিম করা হয়েছে। এতে প্রার্থীদের এজেন্টদের রাখা হয়েছে। আচরণবিধি মানতে তাদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আলমগীর হোসাইন নাবিল/এনএইচআর/জেআইএম