জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে ৪২ কোটি ৬৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকার একটি প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। টিকা দিতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৭ খাতে। শুধু পরামর্শকের পকেটে যাবে ১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
‘পথকুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ বিস্তার রোধ’ প্রকল্পে এমন ‘অযৌক্তিক’ পরামর্শক ব্যয় চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উইংয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের প্রস্তাবনা নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। এসময় পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
অহেতুক পরামর্শক ব্যয় কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। প্রকল্পটি তিন বছরের মেয়াদে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাস্তবায়িত হবে। ৩৭ খাতের অনেক ব্যয়ের যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না কমিশন। চারজনের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতে ২৮ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় বেশি পরামর্শক ব্যয় ধরা প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষের প্রধান ডা. মো. হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ কাজটা করতে এক্সপার্ট লাগবে। এক্সপার্ট ছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। যে কারণে প্রকল্পের পরামর্শক ব্যয় ১৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।’
এটা সেভাবে পরামর্শক বলা যাবে না। অপারেশনের সার্ভিস বলা যায়। পথকুকুরকে টিকা দেওয়া ও নানা সার্ভিস দেওয়ার জন্যই এ ব্যয়।-অতিরিক্ত সচিব ড. অঞ্জন কুমার দেব রায়
দুজন কর্মকর্তার জন্য নানা খাতে ব্যয় ধরা প্রসঙ্গে ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দুজন কর্মকর্তার মোট বেতন একসঙ্গে হয় না। বেতনের ভেতরে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকে। বাড়িভাড়া, বিশেষ সুবিধা, বিনোদন ভাতা ইত্যাদি। সবগুলো একসঙ্গে করেই এ ব্যয় ধরা হয়েছে।’
জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত কুকুরের মাধ্যমে প্রাণীসহ মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত প্রাণী ও মানুষের মৃত্যু হয় শতভাগ। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যায়।
প্রকল্পের উদ্দেশ্যপথকুকুরে গণটিকার মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধ করে প্রাণিস্বাস্থ্যসহ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকরণ। বন্ধ্যাত্বকরণের মাধ্যমে পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন। জনগণের মধ্যে প্রাণীর প্রতি মানবিকতাবোধ এবং জলাতঙ্ক রোগ ও তার প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
১০ জনকে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ, চারজনকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন, প্রাণিটিকা ও ওষুধ কেনা, প্রতিরোধী (এমডিজি) কার্যক্রম নেওয়া, পথকুকুরের নিয়ন্ত্রণ, নিউটার কুকুরের খাদ্য কেনা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ এবং চিকিৎসা বিষয়ক প্রশিক্ষণ। প্রকল্পের আওতায় তিনটি ল্যাপটপ, একটি প্রজেক্টর, ছয়টি এয়ার কুলার ও আসবাবপত্র কেনা হবে।
প্রকল্পে দুই কর্মকর্তার ৯ ধরনের ব্যয় প্রস্তাবপ্রকল্পের আওতায় দুজনের মূল বেতন ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এই দুজন মূলত প্রকল্প পরিচালক ও উপ-প্রকল্প পরিচালক। এছাড়া দুই কর্মকর্তার বাড়িভাড়া খাতে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার, দুজনের চিকিৎসা ভাতা খাতে ১ লাখ ৮ হাজার, দুজনের শিক্ষা ভাতা খাতে ৭২ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এই দুই কর্মকর্তার উৎসব ভাতা ৫ লাখ ৯৪ হাজার, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা ১ লাখ ৯৮ হাজার, মোবাইল ভাতা ৩৬ হাজার, নববর্ষ ভাতা ৬৯ হাজার, বিশেষ সুবিধা ভাতা ৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় আবাসিক টেলিফোন নগদায়ন ভাতা ১ লাখ ১৬ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। ২০ জন আউটসোর্সিং জনবল খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। ১০ জনের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ খাতে ১ লাখ ১৬ হাজার, ইন্টারনেট বিল ৭২ হাজার, দরপত্র বিজ্ঞাপনে ৬ লাখ, ভিডিও ডকুমেন্টারিতে ২০ লাখ, সম্মানি খাতে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় চাওয়া হয়েছে।
সেমিনার ও কর্মশালা খাতে ১৯ লাখ ৪৭ হাজার, অন্য সম্মানি খাতে ১২ লাখ, অন্য মনিহারি খাতে ৬ লাখ, কার হায়ারিং খাতে ৪৯ লাখ ৫০ হাজার, প্রাণী টিকা ও ওষুধ খাতে ২ কোটি ৭৪ লাখ, নিউটার করা কুকুরের খাদ্য খাতে ১ কোটি ৩০ লাখ, অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন খাতে ৭৪ লাখ, ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্সি ফি ২ শতাংশ বাবদ ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্প অফিস রেনোভেশন খাতে ৫ লাখ, তিনটি ডেস্কটপ কম্পিউটার খাতে ৩ লাখ ৬০ হাজার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর স্ক্রিন ও অন্য অ্যাক্সেসরিজ খাতে ৭০ হাজার, ল্যাপটপ কেনায় ১ লাখ ২০ হাজার, ফটোকপি মেশিন কেনায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।
আসবাবপত্র কেনায় ১১ লাখ ৫৩ হাজার, মোবাইল পেট ক্লিনিক খাতে ১ কোটি ৬০ লাখ, আইপিএস কেনায় ১ লাখ, ছয়টি এয়ার কুলার কিনতে ৯ লাখ ৬০ হাজার, সিডিএইচ পেট ক্লিনিকের জন্য সার্জারি ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি খাতে ২ কোটি ৪০ লাখ এবং স্ট্যাটিক ক্লিনিক আপগ্রেডেশনের আওতায় সিডিএইচ-এর পেট ক্লিনিক নির্মাণ খাতে ৯ কোটি ৮৬ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
আরও যেসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশনপ্রকল্পের আরও বেশ কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। পথকুকুরের নিউটার ও চিকিৎসা বিষয়ক প্রশিক্ষণ খাতে ১০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ এবং প্রতি কর্মশালায় ১০০ জন করে তিনটি সেমিনার আয়োজনের সংস্থান রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ বা সেমিনার-কর্মশালায় প্রশিক্ষণার্থী বা অংশগ্রহণকারী হিসেবে কারা উপস্থিত থাকবেন, তা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রকল্পে চারজন ভেটেরিনারি সার্জন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনজন ভেটেরিনারি সার্জন পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও কুকুর নিউটার করার কাজে নিয়োজিত ভেটেরিনারি সার্জনদের সম্মানি হিসেবে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে। এই অর্থ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।
কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল (সিভিএইচ) পেট ক্লিনিকের জন্য সার্জারি ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনার জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা সংস্থান রাখা হলেও তার স্পেসিফিকেশন এবং বাজারদর যাচাই সংক্রান্ত কোনো তথ্য ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) উল্লেখ করা হয়নি।
১৫ কোটি টাকা পরামর্শক ব্যয় রাখা প্রসঙ্গে কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উইংয়ের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) ড. অঞ্জন কুমার দেব রায় বলেন, ‘এটা সেভাবে পরামর্শক বলা যাবে না। অপারেশনের সার্ভিস বলা যায়। পথকুকুরকে টিকা দেওয়া ও নানা সার্ভিস দেওয়ার জন্যই এ ব্যয়।’
৩৭ খাতে অহেতুক ব্যয় প্রসঙ্গে ড. অঞ্জন কুমার দেব রায় বলেন, ‘সবগুলো মিটিং করার পরে বিবেচনা করা হয়েছে। বাইরের অযৌক্তিক ব্যয় বাদ দেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ মানুষ কুকুর, বিড়াল, শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হয়, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু। গবাদিপশুর ক্ষেত্রে কুকুর/বিড়ালের কামড়ের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৩২টি গবাদিপশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে বৈশ্বিক কর্মকৌশলের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি পরিচালনা করে। দেশব্যাপী জলাতঙ্ক প্রতিরোধ টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে চারটি জেলায় প্রথম রাউন্ড ও ১৬টি জেলায় দ্বিতীয় রাউন্ডে আনুমানিক পাঁচ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়।
২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জলাতঙ্কমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে। দেশের সব জেলায় মোট ৬৭টি জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের কামড়জনিত জলাতঙ্কমুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল বিভাগ টিকার মাধ্যমে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কাজ করছে।
জনসচেতনতামূলক এ কর্মসূচি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু দেশ থেকে এই রোগ নির্মূলে প্রয়োজন কুকুরকে জলাতঙ্ক থেকে নিরাপদ করা। কোনো এলাকার শতকরা ৭০ শতাংশ কুকুরকে ব্যাপক হারে টিকা দিলে ওই এলাকার কুকুরের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়। পরপর তিন বছর তিন রাউন্ড টিকা দিলে কুকুর থেকে মানুষ বা অন্য প্রাণীর শরীরে সংক্রমণের হার শূন্যের কোটায় নেমে আসে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কুকুরের গণটিকাদান কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সমন্বয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করেছে।
এমওএস/এএসএ