আন্তর্জাতিক

বেইজিংয়ে স্টারমার-শি বৈঠক, সম্পর্ক দৃঢ় করার অঙ্গীকার

ভূরাজনৈতিক নানা প্রতিকূলতার মুখে চীন ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বেইজিংয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি জটিল ও বহুস্তরপূর্ণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় শক্তি হিসেবে চীন ও যুক্তরাজ্যের সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে বৈঠকের সময় দুই দেশের নেতাই ভূরাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

২০১৮ সালের পর এটিই কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বহু নেতা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন, তারই অংশ হিসেবে স্টারমারের এই সফর।

গ্রেট হল অব দ্য পিপলের জমকালো পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্টারমার শি জিনপিংকে বলেন, চীন ‘বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়’।

স্টারমার বলেন, এমন একটি পরিণত সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে আমরা সহযোগিতার সুযোগগুলো চিহ্নিত করব, আবার যেসব বিষয়ে আমাদের মতভেদ আছে, সেগুলো নিয়েও অর্থবহ সংলাপ চালিয়ে যেতে পারবো।

শি জিনপিংও ‘জটিল’ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হোক কিংবা দুই দেশের অর্থনীতি ও জনগণের জীবনমান উন্নয়ন- সব ক্ষেত্রেই চীন ও যুক্তরাজ্যের সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদার করা দরকার।

শি জিনপিং আরও বলেন, এগিয়ে যেতে হলে কিছু চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে, তবে সহযোগিতাই দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি ‘নতুন অধ্যায়’ উন্মোচন করবে।

তিনি বলেন, ভালো কিছুর সঙ্গেই অনেক সময় কঠিন চ্যালেঞ্জ থাকে। নেতৃত্ব সেই চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাবে না, বরং সাহসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাবে।

শি জিনপিং আরও যোগ করেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অবশ্যই অগ্রণী ভূমিকা নেবে এবং চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক ও সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।

শনিবার পর্যন্ত চীনে অবস্থান করবেন স্টারমার। বৃহস্পতিবারের (২৯ জানুয়ারি) বৈঠক শেষে দুই নেতা একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন। এছাড়া একই দিন সকালে স্টারমার চীনের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা ঝাও লেজির সঙ্গেও বৈঠক করেন ও বিকেলে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে তার আলোচনার কথা রয়েছে।

ঝাও লেজি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঠিক পথে রয়েছে। অন্যদিকে স্টারমার বলেন, এই সফর একসঙ্গে কাজ করার ইতিবাচক পথ খুঁজে বের করার একটি সুযোগ।

ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, অভিবাসী পাচারকারীদের ব্যবহৃত সরবরাহ শৃঙ্খলকে লক্ষ্য করে একটি সহযোগিতা চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য ও চীন।

অনিয়মিত অভিবাসনের বিষয়টি স্টারমারের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনি মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ও অভিবাসন প্রবাহ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) স্টারমার অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র সাংহাই সফর করবেন। এরপর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের জন্য স্বল্প সময়ের জন্য জাপানেও যাবেন তিনি।

সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা

প্রায় এক দশক আগে লন্ডন ও বেইজিং তাদের সম্পর্ককে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। তবে ২০২০ সাল থেকে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যখন বেইজিং হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন আরোপ করে ও সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশটিতে গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালায়।

স্টারমারের সঙ্গে আলোচনায় হংকংয়ের গণমাধ্যম উদ্যোক্তা ও গণতন্ত্রপন্থি নেতা জিমি লাইয়ের বিষয়টি উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৭৮ বছর বয়সী লাই গত ডিসেম্বর ‘যোগসাজশ’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন ও তাকে দীর্ঘ কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুপ্তচরবৃত্তি ও সাইবার হামলার অভিযোগ, পাশাপাশি ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের প্রতি চীনের সমর্থন- এই সব বিষয়ও দুই দেশের সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করেছে।

তারপরও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন যুক্তরাজ্যের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে ব্রিটিশ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে চীনে রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে।

২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসা স্টারমারের এই সফরটি গত বছর অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভসের বেইজিং সফরের ধারাবাহিকতা। লেবার সরকার বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করা ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে।

স্টারমারের সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন অর্থনীতি, ওষুধ শিল্প, অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন খাতের প্রায় ৬০ জন ব্যবসায়ী নেতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিরা। তিনি একদিকে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার ভারসাম্য রক্ষা করছেন।

এদিকে, স্টারমারের এই চীন সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা ও যুক্তরাজ্যসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে লন্ডনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

সূত্র: এএফপি

এসএএইচ