বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংযোজন হলো প্রবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে বিদেশে বসেই ভোট দেওয়ার এই সুযোগ প্রবাসী সমাজে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী নয়, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকটি গুরুত্ব দিয়ে প্রবাসীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে আবেগ, দায়িত্ববোধ ও প্রত্যাশার কথা।
মালয়েশিয়াপ্রবাসী রেমিট্যান্সকর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের জন্য কাজ করছি, পরিবার চালাচ্ছি, রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছি। কিন্তু ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এবার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারব এটা নাগরিক হিসেবে বড় স্বীকৃতি।
প্রবাসী পেশাজীবী মো. আব্দুল কাদেরের ভাষায়, ভোটাধিকার মানে শুধু একটি ব্যালট নয়; এটি আমাদের মতামতের মূল্যায়ন। বিদেশে থেকেও দেশের সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারা মানসিকভাবে অনেক শক্তি দেয়।
অনেক প্রবাসী মনে করেন, এই উদ্যোগ তাদের দেশের সঙ্গে সংযোগ আরও দৃঢ় করেছে। দূরত্বের দেয়াল ভেঙে রাষ্ট্র যেন তাদের কাছে হাত বাড়িয়েছে এমন অনুভূতিই বেশি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে সতর্ক আশাবাদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রবাসী নূরু বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে এটা আমরা চাই। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ থাকে এবং ভোটের ফলাফলে কারও সন্দেহের সুযোগ না থাকে, তাহলে নির্বাচন উৎসবমুখর হতে পারে।
তবে আশঙ্কার কথাও অকপটে বলেছেন অনেকে। প্রবাসী ব্যবসায়ী জাহিদ বলেন, পোস্টাল ব্যালট সময়মতো পৌঁছানো, ফেরত পাঠানো এবং সঠিকভাবে গণনা এই তিনটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্বচ্ছতা না থাকলে প্রবাসীদের আস্থা নষ্ট হতে পারে।
এই আশঙ্কা নিরসনে প্রবাসীরা প্রস্তাব দিচ্ছেন, ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে স্পষ্ট নির্দেশনা, ট্র্যাকিং সুবিধা এবং দূতাবাসভিত্তিক তথ্য সহায়তা কেন্দ্র চালু করা। এতে অংশগ্রহণ বাড়বে এবং সন্দেহ কমবে।
দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকেও দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার এই সুযোগ ভবিষ্যতে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করেন প্রবাসীরা। প্রবাসী গবেষক চৌধুরী আকাশ বলেন, ভোটাধিকার প্রবাসীদের কেবল অর্থনৈতিক অবদানকারী নয়, বরং সক্রিয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এতে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতেও প্রবাসীদের গুরুত্ব বাড়বে।
প্রবাসী নূর হোসেনের মতে, দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেক সময় আবেগ আর রেমিট্যান্সে সীমাবদ্ধ থাকে। ভোটাধিকার সেই সম্পর্ককে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিলো।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে প্রবাসী বিনিয়োগ, দক্ষতা বিনিময় ও সামাজিক উদ্যোগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচনের পর যে নতুন সরকার গঠিত হবে, তাদের কাছে প্রবাসীদের প্রত্যাশাও স্পষ্ট। প্রবাসী আলী নূর বলেন, প্রবাসী ভোট ব্যবস্থা যেন নিয়মিত ও উন্নত করা হয়-ডিজিটাল নিবন্ধন, নিরাপদ ব্যালট এবং সহজ যোগাযোগ চাই।
এছাড়া প্রবাসীরা কনস্যুলার সেবা সহজীকরণ, প্রবাসী কল্যাণ তহবিলের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং বিদেশে কর্মরতদের অধিকার রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রবাসী শিক্ষার্থী আবদাল বলেন, আমরা চাই দেশের নীতিতে প্রবাসীদের কণ্ঠ প্রতিফলিত হোক, শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সারা বছর।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। প্রবাসীদের বক্তব্যে স্পষ্ট তারা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন চান। পোস্টাল ব্যালটের সফল বাস্তবায়ন কেবল একটি নির্বাচনী উদ্যোগ নয় এটি রাষ্ট্র ও প্রবাসী নাগরিকের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন। এই আস্থা ধরে রাখতে পারলেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এমআরএম/এমএস