আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের ম্যাচ খেলবে না। এমন ঘোষণা আসার পর শোনা গিয়েছিল, আইসিসি তার বোর্ড সদস্যদের নিয়ে জরুরি মিটিংয়ে বসতে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং এই ইস্যুতে আইসিসি এখন অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায়, কী করবে যেন বুঝতে পারছে না।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি হওয়ার কথা ছিল ভারত-পাকিস্তান হাইভোল্টেজ ম্যাচ। এই ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। রোববার ঘোষিত এই সিদ্ধান্তে আইসিসি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় পড়েছে এবং বিষয়টি সমাধানে পর্দার আড়ালে তৎপরতা শুরু করেছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ডন’।
সূত্র জানায়, নির্ধারিত ম্যাচের প্রায় ১৫ দিন আগেই সিদ্ধান্ত জানানোয় আইসিসির হাতে বিকল্প পথ খোঁজার জন্য কিছুটা সময় রয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) আপত্তি বা উদ্বেগ আমলে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে আইসিসিকে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে আরও কয়েকটি দেশের ক্রিকেট বোর্ড।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্তে পাকিস্তান সরকার কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করলেও অতীতে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে এমন সিদ্ধান্তের নজির রয়েছে। নিরাপত্তা উদ্বেগে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। একইভাবে রাজনৈতিক কারণে ২০০৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ খেলেনি যথাক্রমে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এবার পাকিস্তানের সিদ্ধান্তটি ভিন্ন, কারণ কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সূত্র জানায়, পিসিবি ২০১৮ সালে ভারতের বিরুদ্ধে করা একটি মামলার রায়ের ওপর নির্ভর করছে। ওই মামলায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ২০১৪ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ছয়টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ আনে পাকিস্তান।
ওই এমওইউর বিনিময়ে পিসিবি আইসিসির ‘বিগ থ্রি’ রাজস্ব বণ্টন কাঠামোকে সমর্থন করেছিল। যার ফলে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড বেশি রাজস্ব পায়। মামলার শুনানিতে বিসিসিআই প্রথমে জানায়, পাকিস্তানে সফর না করার কারণ ব্যাখ্যা করতে তারা বাধ্য নয়। পরে দাবি করা হয়, ভারত সরকার সফরের অনুমতি দেয়নি। তবে লিখিত নির্দেশনা চাইলে বিসিসিআই জানায়, এমন সিদ্ধান্ত মৌখিকভাবে জানানো হয়।
এদিকে, পিসিবি আশঙ্কা করছে, বিসিসিআইয়ের প্রভাবের কারণে আইসিসির বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটি (ডিআরসি) আবারও পাকিস্তানের বিপক্ষে রায় দিতে পারে। যার ফলে আর্থিক জরিমানা বা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে দেশটি। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও ভাবছে পাকিস্তান সরকার।
সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি ঘটনার রায়ও পাকিস্তানের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরানোর আবেদন করলে আইসিসি তা প্রত্যাখ্যান করে এবং উল্টো বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৪-২ ভোটে গৃহীত ওই সিদ্ধান্তে কেবল পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বিপক্ষে ভোট দেয়।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে লাভজনক ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই এক ম্যাচ থেকেই সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা) আয়ের সম্ভাবনা থাকে। একটি ভারত-পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের দাম পড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৪০ লাখ রুপি।
পাকিস্তানের ঘোষণার পর আইসিসি এক বিবৃতিতে পিসিবিকে ‘সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার’ আহ্বান জানিয়েছে। আইসিসি জানায়, নির্বাচিত ম্যাচে অংশ না নেওয়া বৈশ্বিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইসিসি আরও বলেছে, ‘খেলার সততা, প্রতিযোগিতামূলক মান, ধারাবাহিকতা ও ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত অংশগ্রহণ সেই চেতনা ক্ষুণ্ন করে।’ সংস্থাটি সতর্ক করে জানায়, এ সিদ্ধান্ত পাকিস্তানসহ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ক্রিকেটভক্তের স্বার্থের পরিপন্থী।
এদিকে, পাকিস্তান দল না খেললেও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতীয় দল কলম্বোতে উপস্থিত থাকবে বলে জানা গেছে। নির্ধারিত সময়ে পাকিস্তান মাঠে দল না নামালে টুর্নামেন্ট নিয়ম অনুযায়ী ভারত পয়েন্ট পেয়ে যাবে।
এমএমআর