দেশজুড়ে

বন্দুকের গুলি ছুঁড়ার পর জামাত শুরু হয় শোলাকিয়ায়

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া। দেশে-বিদেশে এক নামে যার পরিচিত। দেশের বৃহত্তর এবং উপ-মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঈদগাহ। বার ভুইয়াদের প্রধান মসনদ-ই আলা বীর ঈশাখার বংশধর কিশোরগঞ্জ হয়বতনগর জমিদার বাড়ির লোকজন প্রায় আড়াইশ বছর আগে শোলাকিয়া ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরে এখানে লাখো মানুষের ঢল নামে। দেশ বিদেশের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মুসল্লির পদভারে মুখরিত হয়ে উঠে নরসুন্দা পাড়ের জেলা শহর কিশোরগঞ্জ। শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতকে ঘিরে পুরো শহরে যেনো উৎসবের রং লাগে। সারা শহরকে সাজানো হয় রঙ বেরঙের ব্যানার-ফ্যাস্টুনে। রাস্তায় রাস্তায় শোভা পায় দৃষ্টিনন্দন তোরণ। তবে শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে ঈদের জামাতের আগে বেশ কয়েকবার বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছুড়ার মুহূর্তটি। সেই বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকে লাখো মানুষ।এবারের জামাত : এবার শোলাকিয়ায় ১৮৯তম ঈদ-উল ফিতরের জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে। জামাত শুরু হবে সকাল ১০টায়। এতে ইমামতি করবেন বাংলাদেশ ইসলাহুল মুসলেমিন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। প্রতি বছরের মতো এবারও শোলাকিয়া মাঠ থেকে ঈদের জামাত সরাসরি সম্প্রচার করছে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আই।অবস্থান : কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব পাশে নরসুন্দা নদীর তীর ঘেঁষে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের অবস্থান। একপাশে নরসুন্দা নদী আরেক দিকে রেললাইন শহরকে আলাদা করেছে শোলাকিয়া থেকে। এ মাঠের বৈশিষ্ট হচ্ছে মাইকস্ট্যান্ড ছাড়া পুরো মাঠের কোথাও ইট-সিমেন্টর কাজ নেই। সবুজে ঢাকা পুরো মাঠ। চারপাশে ছোট-বড় সবুজ গাছ। সামনে বিশাল পুকুর। মাঠের পশ্চিম দিকে একতলা মসজিদ ও মিনার। মূলত এর ছাদে ঈদের সময় সামিয়ানা টানিয়ে সেখানে মাঠের ইমাম মুসল্লিদের উদ্দেশে বয়ান করেন। শহরের বিশিষ্ট জনেরা ঈদের নামাজ পড়েন দ্বিতীয় তলায়। আর মিডিয়ার লোকজনের অবস্থানও হয় সেখানে। মূলত তেমন কোনো চাকচিক্য নেই। তবে শোলাকিয়ার সুনাম দেশ ছাড়িয়ে এখন সারাবিশ্বে। বাংলাদেশতো বটেই, উপ-মহাদেশের বৃহত্তর ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় শোলাকিয়ায়।প্রতিষ্ঠার কথা : ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নানা মতবিরোধ আছে। তবে এখন পর্যন্ত স্বীকৃত মতবাদ অনুযায়ী ঈশাখাঁর ১৬তম বংশধর কিশোরগঞ্জের হয়বতনগর জমিদার বাড়ির লোকজন শোলাকিয়া ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৮ সালে হয়বতনগর সাহেব বাড়ির জমিদার সৈয়দ আহম্মদ শোলাকিয়ায় তারই ইমামতিতে প্রথম ঈদের জামায়াত পরিচালনা করেন। তখনও শোলাকিয়া ঈদগাহের জমি আলাদা করে দেয়া হয়নি। পড়ে দেওয়ান মান্নান দাঁদ খান এ মাঠের কলেবর বৃদ্ধি করেন। মূলত, তার সময় থেকেই শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের প্রসার ঘটে। ১৯৫০ সালে ঈশাখাঁর বংশধর দেওয়ান মান্নান দাদ খান শোলাকিয়া ঈদগাহের জন্য জমি ওয়াকফ করেন। ওই ওয়াকফ দলিলে উল্লেখ আছে, তারও প্রায় দুইশ বছর আগে থেকে শোলাকিয়ায় ঈদের জামায়াত হয়ে আসছে। সেই হিসেবে শোলাকিয়া ঈদগাহ প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো।নামকরণ: শোলাকিয়া ঈদগাহের নামকরণের সঠিক ইতিহাস এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। এর নামকরণ নিয়ে আছে মতবিরোধ। প্রচলিত আছে একাধিক জনশ্রুতি। শোলাকিয়ায় প্রথম ঈদের জামায়াতেই বিপুল পরিমাণ মুসুল্লি অংশ নিয়েছিলেন। দিন দিন এ মাঠে মুসুল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকে। জনশ্রুতি আছে কোনো এক ঈদের জামায়াতে শোলাকিয়া ঈদগাহে মুসুল্লি সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে সোয়া লাখে (১ লাখ ২৫ হাজার) পৌঁছেছিল। সেই থেকে এ মাঠের নামকরণ হয় ’সোয়ালাখিয়া।’ পরে কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক উচ্চারণে এর নামকরণ দাঁড়ায় সোয়ালাখিয়া থেকে শোলাকিয়া। আরেকটি জনশ্রুতি হচ্ছে, জমিদাররা প্রজাদের কাছ থেকে যে ভূমি রাজস্ব আদায় করতেন তার পরিমাণ এক বছর রেকর্ড পরিমাণ সোয়ালাখ মুদ্রায় দাঁড়িয়েছিল। সে থেকে এর নাম সোয়ালাখিয়া বা শোলাকিয়া। তবে প্রথম জনশ্রুতি থেকে শোলাকিয়া নামকরণ করা হয় বলে এলাকায় বহুল প্রচলিত রয়েছে। আয়তন: শোলাকিয়া ঈদগাহে জমির পরিমাণ ৬.৬১ একর। চারদিকে দেয়াল ঘেরা মাঠের পশ্চিম সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩৩৫ ফুট এবং পূর্ব সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩৪১ ফুট, উত্তর সীমারেখা পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৪ ফুট। ঈদের সময় মাঠের উত্তর-দক্ষিণে ২৬৫টি কাতার বা সারি হয়। প্রতি সারিতে ৫শ করে স্বাভাবিকভাবে মুসুল্লি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারেন। সে হিসেবে মুসল্লির সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৫শ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাঠের ভেতর-বাইরে প্রতিবছর ঈদুল ফিতরে মুসুল্লির সংখ্যা হয় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। গত বছর ঈদ-উল ফিতরের  জামাতে রেকর্ড সংখ্যক মুসুল্লি অংশ নেন। বর্তমানে মাঠের পশ্চিম দিকে সাউন্ড সিস্টেমেরও উন্নয়ন করা হয়েছে। নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে অজুখানা।বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে জামাত শুরু : বিশাল আকৃতির শোলাকিয়া মাঠ। নামাজ শুরুর সময় মাঠের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত ভালো করে দেখা যায়না। তাই মাঠের বিভিন্ন স্থানে চল্লিশটির মতো মাইক লাগানো থাকে। কয়েক সারি পরপর একেকটি উঁচু স্থানে একজন করে মুক্তাদি ইমাম সাহেবের অনুকরণে সজোরে আওয়াজ করেন। অন্য মুসুল্লিরা তাদের অনুসরণ করেন। তবে  জামাত কখন শুরু হচ্ছে, এ জন্য অপেক্ষায় থাকেন মুসুল্লিরা। শুরুর ১০ মিনিট, ৫ মিনিট ও সর্বশেষ ৩ মিনিট আগে বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে নামাজ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। যেভাবে পরিচালিত : কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে শোলাকিয়া ঈদগাহের সভাপতি। তার নেতৃত্বে একটি কমিটি শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান পরিচালনা করে আসছে। হয়বতনগর দেওয়ান বাড়ির একজন প্রতিনিধি জমিদাতা হিসেবে মাঠের মোতওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রতি বছর ঈদের আগে জামায়াতের ইমাম নির্ধারণ করা হয়। গত প্রায় ৩০ বছর ধরে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাতে ইমামতি করেছেন হয়বতনগর আলীয়া মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হযরত মাওলানা আবুল খায়ের মো. নুরুল্লাহ। পরে তারই পুত্র মাওলানা আবুল খায়ের মো. ছাইফুল্লাহ কয়েক বছর ইমামতি করেন। গত কয়েক বছর ধরে ঈদুল ফিতরের জামাতে ইমামতি করছেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ।শেষ কথা : শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে যেতে হয় রেললাইন পার হয়ে একটি মাত্র রাস্তায়। তবে বিকল্প রাস্তা না থাকায় জ্যামে পড়ে অনেক মুসুল্লি নামাজে অংশ নিতে পারেন না। তবে আশার কথা দীর্ঘ ২০ বছর চেষ্টার পর সম্প্রতি শোলাকিয়া মাঠের সামনে নরসুন্দা নদীর ওপর পাকা সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোলাকিয়া মাঠে অন্তত একবার ঈদের নামাজ পড়বেন-এমন আশাবাদ কিশোরগঞ্জবাসীর।এমএএস/এমএস