বাংলাদেশে তারা এখন অপরাধী ও পলাতক হিসেবে বিবেচিত- মানবতা-বিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ থেকে শুরু করে দুর্নীতির নানা অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু কলকাতার ব্যস্ত শপিংমলের ভিড় ঠেলে, ব্ল্যাক কফি ও ভারতীয় ফাস্টফুডের টেবিলে বসে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা দেশে ফেরার ছক কষছেন। হ্যাঁ, এমনটিই বলছে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) পত্রিকাটির একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, ১৬ মাসেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। বিক্ষুব্ধ জনতার ঢল তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে তিনি হেলিকপ্টারে করে নাটকীয়ভাবে ভারতে পালিয়ে যান। পেছনে রেখে যান রক্তাক্ত দেশ। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের সেই গণঅভ্যুত্থানে তার সরকারের চূড়ান্ত দমন-পীড়নে প্রাণ হারান প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ।
শেখ হাসিনার পতনের পরপরই আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী গণপিটুনি, প্রতিশোধ ও ক্রমবর্ধমান মামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তাদের মধ্যে ৬০০-রও বেশি আশ্রয় নেন সীমান্তবর্তী কলকাতায়, যেখানে তারা এখনো আড়ালে অবস্থান করছেন।
ভারত তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত বছরের মে মাসে জনমতের চাপে আন্তঃবর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করে দেয় এবং দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা, দুর্নীতি সহ নানান অপরাধে তদন্ত ও বিচার শুরু করে। ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রচারণাও নিষিদ্ধ করা হয়।
গত বছরের শেষদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে ফাঁসির দণ্ড দেয়। তবে এই রায়কে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে ভারত থেকেই নিজের প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছেন হাসিনা। এর মধ্যে রয়েছে- আসন্ন নির্বাচন ব্যাহত করতে হাজারো সমর্থককে সংগঠিত করার চেষ্টা।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ভারতের রাজধানী দিল্লির গোপন ও সুরক্ষিত আশ্রয়ে বসে হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও মিটিং ও কল করছেন বাংলাদেশে অবস্থানরত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে। তার সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে ভারতের বিজেপি সরকারের নজরদারির মধ্যেই, যারা ক্ষমতায় থাকাকালে হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। এরই মধ্যে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ ভারত উপেক্ষা করেছে।
গত এক বছরে কলকাতা থেকে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ (এমপি) শীর্ষ নেতা-কর্মীরা নিয়মিত দিল্লিতে গিয়ে হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করছেন। তাদের একজন নিষিদ্ধঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের বাংলাদেশে থাকা নেতা-কর্মী, তৃণমূল, পেশাজীবী সবাইকে নিয়ে প্রতিনিয়ত যোগাযোগে আছেন। সামনে যে সংগ্রাম আসছে, তার জন্য দলকে প্রস্তুত করছেন। ছাত্রলীগকে অন্তর্বর্তী সরকার ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতা-বিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, যা তিনি অস্বীকার করেন।
তিনি আরও বলেন, নেত্রী কখনো কখনো ১৫-১৬ ঘণ্টা মিটিং করেন। তিনি খুবই আশাবাদী যে, ফের দেশে ফিরবেন। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি নায়ক হিসেবেই বাংলাদেশে ফিরবেন।
হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত শেষ দুইটি জাতীয় নির্বাচন ছিল ভোট কারচুপির ব্যাপক অভিযোগে কলঙ্কিত। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকের মধ্যে প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ।
কিন্তু আওয়ামী লীগের অভিযোগ, তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচন করাই গণতন্ত্রের বৈধতাকে খর্ব করে। হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিতেই ইউনূস সরকার এসব করছেন। তবে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ইউনূস।
হাসিনা সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আমরা কর্মীদের প্রচারণা, ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে নির্বাচনের সব কার্যক্রম এড়িয়ে চলতে বলেছি। এটি একটি প্রহসন।
জাহাঙ্গীর কবির নানক/ ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের অভিযোগ, তাদের শত শত কর্মী হামলার শিকার, নিহত বা বিনা জামিনে কারাগারে। অনেকে এখনো আত্মগোপনে। সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমরা কলকাতায় আছি জেলখানার ভয়ে নয়। আমরা জানি, দেশে গেলে আমাদের মেরে ফেলা হবে।
এদিকে, বাংলাদেশের বৃহৎ একটি গোষ্ঠীর কাছে আওয়ামী লীগের হঠাৎ গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলটির ‘ভণ্ডামি’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বহু বছর ধরে মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের নথিতে হাসিনার শাসনামলে বিরোধী মত দমন, হাজারো নিখোঁজ, গোপন জেলে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা উল্লেখ আছে। তার আমলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস হয়ে যায়; নির্বাচন পরিণত হয় প্রহসনে।
ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতের জন্যও বিব্রতকর হয়ে উঠছে। স্থগিত হওয়া একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড ভারতে চলতে দেওয়া ও বাংলাদেশের কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ রাজনৈতিক পলাতকদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কও খারাপ হয়েছে। কলকাতায় থাকা নেতারা বলেন, ভারত তাদের ফেরত পাঠাবে- এমন আশঙ্কা নেই।
গত সপ্তাহে দিল্লিতে হাসিনার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যে এই টানাপোড়েন চরমে ওঠে। বাঙ্কার থেকে রেকর্ড করা অডিওতে তিনি আসন্ন নির্বাচনকে ‘রক্তস্নাত বাংলাদেশ’ বানানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ইউনুসকে ‘বলপূর্বক ক্ষমতা দখলের’ অভিযোগ তোলেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা বলে, ভারতের রাজধানীতে এমন অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া ও গণহত্যাকারী হাসিনাকে ঘৃণামূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া। এটি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা। যদিও ভারত সরকার এই প্রতিক্রিয়ার কোনো জবাব দেয়নি।
এদিকে, কলকাতার বিলাসবহুল বাড়িগুলোতে বসে দলীয় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনুশোচনার কোনো লক্ষণও চোখে পড়ছে না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের দাবি, যে অভ্যুত্থানে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, তা কোনো গণ-অভ্যুত্থান ছিল না, বরং ‘একটি ছোট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’।
আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম/ ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ওটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান ছিল না, ওটা ছিল সন্ত্রাসীদের হাতে সরকার উৎখাত। মানবতা-বিরোধী অপরাধের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি হেসে বলেন, সবই ভুয়া, ভুয়া, ভুয়া।
প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাসিত নেতাদের প্রত্যাবর্তন কৌশল এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের ব্যর্থতার ওপর। তাদের দাবি, এই নির্বাচন স্থিতি বা শান্তি ফেরাতে পারবে না; শেষ পর্যন্ত জনগণ আবার আওয়ামী লীগের কাছেই ফিরে আসবে।
সাবেক এমপি তানভীর শাকিল জয়, যিনি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কলকাতায় থাকছেন, স্বীকার করেন, আমরা সাধু ছিলাম না। আমরা কর্তৃত্ববাদী ছিলাম, পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিলাম না। ২০১৮ সালের নির্বাচনও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য ছিল না। আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা হয়নি।
দুর্নীতি ও লুটপাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনিয়ম ছিল, অবশ্যই ছিল। কিছু আর্থিক ব্যাপার হওয়া উচিত ছিল না, এর দায় আমাদেরই নিতে হবে। তবে তিনি অস্বীকার করেন যে ১৫ বছরে ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলার লুট করা হয়েছে।
কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের অন্যদের মতো তিনিও মনে করেন, নির্বাসন খুব বেশি দীর্ঘ হবে না, যদিও দেশে ফিরলে কারাগারে যাওয়া লাগতে পারে। শাকিল বলেন, এখন সবকিছুই আমাদের জন্য খুব অন্ধকার। কিন্তু এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আমি মনে করি না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসএএইচ