রাজনীতি

ঢাকা-১৪ আসনে ‘আদর্শ প্রচারণা’

মিরপুর মাজার রোড ধরে কিছু দূর এগোলেই জমিদার বাড়ি। এখানকার জমিদারপুত্র বাতেন হুজুরের নামে গড়ে উঠেছে বাতেন নগর। মসজিদ, মাদরাসা ও খেলার মাঠ পার হয়ে এলাকা পৌঁছালে দেখা যায়, মাঠের এক কোনায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর নির্বাচনি কার্যালয় পাশাপাশি অবস্থান করছে। মাঝখানে ব্যবধান চায়ের দোকান।

চা দোকানে কথা হলে আতিকুর রহমান নামের একজন বলেন, ‘কেবল অফিস পাশাপাশি নয়, আমাদের এখানে সবার মধ্যে মিল আছে। হানাহানি নেই। আমাদের প্রার্থী তুলি আপা (সানজিদা ইসলাম তুলি) বলেন, ‘আরমান ভাই আমার ভাই। ভাই জিতলে আমিই জিতে যাবো’। আবার জামায়াতের প্রার্থী আরমান ভাই বলেন, ‘তুলি আমার বোন। সে জিতলেও আমার সমস্যা নেই’। তাহলে আমাদের কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব রেখে লাভ কী?’

জামায়াতের নির্বাচনি অফিসে চা পান করছেন দুজন। সালাম বিনিময় করে জামায়াতের রাজনীতি করেন কি না জিজ্ঞেস করতেই খোকন শেখ (৬৭) বলেন, আমি পেশায় ড্রাইভার। হানিফ নাবিল গাড়ি চালাই। অবসরে এখানে আসি বসি। মূলত দল করি না। তবে ভোটের আমানতটি জায়গায় দেবো, যাতে আল্লাহ জিজ্ঞেস করলে সদুত্তর দিতে পারি।

ঢাকা-১৪ আসনে প্রার্থীদের তালিকা

এলাকায় ভোট কেন্দ্র দখল বা পেশিশক্তি প্রদর্শনের শঙ্কা আছে কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এখানে এগুলো চলে না। সবার সঙ্গে সবার যোগাযোগ ও সমন্বয় আছে। কে কার জন্য কেন্দ্র দখল করবে? কেন করবে? এখানে ভোট হবে নীরবে। কোনো আওয়াজ হবে না। এখানে সামাজিক শৃঙ্খলা আছে।

শুধু মিরপুর মাজার রোডের বাতেন নগরে নয়, পুরো ঢাকা-১৪ আসনের নির্বাচনি মাঠে এ চিত্র। বিএনপি বা জামায়াতের প্রার্থী কেউ কারো বিরুদ্ধে কথা বলেন না। প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিকল্পনা জনগণের কাছে তুলে ধরছেন। প্রার্থীরা সম্মান দিচ্ছেন একে অপরকে। এমনকি এদের মধ্যে পারিবারিক যাতায়াত এবং সম্পর্কও আছে। ব্যারিস্টার আরমান গুম থাকা অবস্থায় সানজিদা ইসলাম তুলি তার পরিবারকে সাহস ও সহায়তা দিয়েছেন। গুম থেকে ফিরে তুলির বাসায় গিয়েছেন আরমান। তুলির মায়ের সঙ্গে তার আবেগঘন মুহূর্তের ভিডিও ভাইরালও হয়।

বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, আরমান ভাই আমার সেই ভাই যার ফেরত আসার জন্য আমরা লড়াই করেছি। দীর্ঘ আট বছর ‘আয়না ঘরে’ বন্দি থাকার পর তিনি ফিরে আসেন। তিনি ফিরে এসেছেন— এটা আমার জন্য আনন্দের। কিন্তু আমার ভাই (বিএনপি নেতা সুমন) আজও ফেরেনি।

ব্যারিস্টার আরমানও প্রায়ই বলেন, ‘তুলি আমার বোন। তার জন্য শুভ কামনা।’ এক টেলিভিশন টকশোতে আরমানকে বার বার প্রতিপক্ষ নিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি স্পষ্টত বলেছেন, ‘আমি আমার কথা তুলে ধরতে চাই। তারা তাদের কথা তুলে ধরবে।’ অর্থাৎ তারা কেউ কাউকে আক্রমণ করে কথা বলেন না।’

সারাদেশে নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা, ময়লা পানি নিক্ষেপ, ডিম নিক্ষেপ এমনকি মারামারি থেকে খুনের ঘটনা মধ্যে ঢাকা-১৪ আসনের  বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচারণাকে ‘আদর্শ প্রচারণা’ বা দৃষ্টান্তমূলক বলছেন স্থানীয়রা।দারুসসালামের বাসিন্দা ডা. শেখ মইনুল খোকন বলেন, এখানে দুই প্রার্থীর এমন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আমাদের মুগ্ধ করে। এমনটা আমরা সারাদেশে চাই। আমরা মনে করি, এটি সম্ভব হচ্ছে দুজন প্রার্থীই উচ্চ শিক্ষিত, বোঝাপড়া ভালো বলে। দীর্ঘসময় দুজনেই জুলুমের মধ্যদিয়ে গেছেন। কষ্ট বোঝেন। আগামীর নতুন বাংলাদেশ গঠনের গুরুত্ব অনুধাবন করেন, যেটি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে সম্ভব নয়।

কাউন্দিয়া, বনগাঁও এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ডজনখানেক প্রার্থী। তারা হলেন, বিএনপির সানজিদা ইসলাম তুলি, জামায়াতের মীর আহমাদ বিন কাসেম, স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রয়াত এমপি এসএ খালেকের ছেলে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু), জাতীয় পার্টির হেলাল উদ্দিন, এলডিপির সোহেল রানা, এবি পার্টির মনিরুজ্জামান, জেএসডির নুরুল আমিন, কমিউনিস্ট পার্টির রিয়াজ উদ্দিন, গণফোরামের জসিম উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের আবু ইউসুফ, রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন ও সুপ্রিম পার্টির ওসমান আলী।

এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬, নারী ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। 

ভোটের মাঠে কে এগিয়ে এমন প্রশ্নে বিএনপির সমর্থক আতিকুর রহমান বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলে ভোটে বিএনপির কাছে জামায়াত পাত্তাই পাইতো না। কিন্তু এখন তো খেলা ভিন্ন। কী হবে বলা মুশকিল। পাশ থেকে আরেকজন বলেন, আমরা তো মানুষ ভালো না। একজনেরটা খাই, ভোট দিই আরেকজনকে। এ কারণে এখন বলা যাচ্ছে না, কোন দিকে যাবে।

এসইউজে/এমএএইচ/