একুশে বইমেলা

অলকানন্দা শহরে: কবিতার সরোবরে অমৃত মন্থন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

কবি সুমন কুমার দত্ত। লেখেন তার নিজস্ব শৈলীতে। তার কবিতা নাতিদীর্ঘ। মেদহীন, বাচালতাহীন। যা বলতে চান সরাসরি বলতে পারেন। আড়াল হারায় না আবার লক্ষ্যও চ্যুত হয় না। শব্দ নিয়ে মকশো নেই, কবিতার ফর্ম নিয়ে কারিগরি নেই। কবির লেখায় পাঠকের প্রবেশ সহজসাধ্য। কবিতার সরোবরে পাঠক মনমতো অবগাহন করে পরম হংসের স্বাচ্ছন্দ্যে অমৃত মন্থন করতে পারেন।

দীর্ঘদিন ধরেই তিনি সাহিত্য রচনা করে চলেছেন। নিজের লেখাগুলোকে মলাটবন্দি করার প্রয়াস তার দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রকাশক-লেখক সম্পর্কের মধ্যে আজকাল বাণিজ্যের পসরা ঢুকে যাওয়ায় কবিতার নান্দনিকতা উপেক্ষিত হয়ে আসছিলো। তারপরও দৈনন্দিন যাপিত জীবনের টানাপোড়েনকে জয় করে সুমন কুমার দত্ত কবি হিসেবে মলাটবন্দি হলেন। এটি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। নামটাও চমৎকার। ‌‘অলকানন্দা শহরে’। অলকানন্দা এক পবিত্র নদী যেমন; তেমনি অলকানন্দা একটা নান্দনিক পুষ্পের নাম। আবার কবির মানসচেতনায় যে নারীমুখ আসে-যায়; সে-ও অলকানন্দা। কবির অলকানন্দা আজ শহরে। কবি তাই আনন্দে উদ্বেলিত।

‘অলকানন্দা শহরে’ কাব্যগ্রন্থটি সাঁইত্রিশটি কবিতাকে ধারণ করে অবয়ব লাভ করেছে। প্রথম কবিতার শিরোনাম ‘বিস্ময় আগামীর পথ’ এবং শেষ কবিতাটি ‘অলকানন্দা’। কবির প্রেয়সী অলকানন্দাকে কবি নাম দিয়েছেন অত্রিকা বলে। অত্রিকার প্রয়াণে কবি শোকার্ত, স্মৃতিদগ্ধ। অলকানন্দা নদীর পাড়ে কবি অত্রিকার ভস্ম জড়ো করে তাকে অন্তর্জলী দিয়েছেন। কবির অত্রিকা মিশে যায় অথই অলকানন্দার জলে। তবু হৃদয়ের কল্লোলে তার অত্রিকা সতত প্রবহমান প্রণয়ের ফল্গুধারা তুলে।

আরও পড়ুনতুমি এলে হারিয়ে যাওয়ার দিনে: আনন্দ-বেদনার মিশ্রণ 

সুনীলের নীরার মতো, জীবনানন্দের সুরঞ্জনার মতো সুমনেরও প্রেয়সীর এক বিশেষ নাম আছে। সুমনের সেই প্রেয়সী দেবশমিতা, যার প্রণয়ে তার হৃদয়রাজ্যে চিরবসন্ত বিরাজ করে। দেবশমিতারা পুরোনো হয় না, দূরে সরে না, হৃদয়ের গহীনে লেপ্টে থাকে সুখস্মৃতি হয়ে। তারা দিন যাপনে হামলা করে না কিন্তু জীবনকে যাপনের উপলক্ষ তৈরি করে দেয়। অত্রিকা, অলকানন্দা কিংবা দেবশমিতারা বেশি দাপট দেখালে সুমন তখন নিজেকে ভাবেন বিসর্জনের কার্তিক হিসেবে। কার্তিকের মতো সুন্দর বর সবার কাঙ্ক্ষিত হলেও সুমন কেন যেন বারে বারে তার প্রণয়ীদের কাছে বিসর্জনের স্বীকার হয়েছেন।

ভূমিকায় সুমন উল্লেখ করেছেন, তিনি কবিতা লেখেন বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু তবুও কি চাইলেই বেঁচে থাকা যায়? কবিতায় তিনি তার জীবন দর্শনকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলেই তিনি অবলীলায় বলতে পারেন, জীবন হচ্ছে সাড়ে তিন হাত দীর্ঘ এক উপন্যাস। জীবন সম্পর্কে কী গভীর বোধ! জীবনের এই দার্শনিক সংজ্ঞা সুমন কত সহজে, কত অবলীলায় নির্মাণ করতে পারেন! আসলে কবিতায় বাঁচতে চাওয়া কবির কাছে এটাই পরম সত্য।

মহাকালের কবি যেমন সুমন; তেমনই স্বকালের কবিও তিনি। চব্বিশের অস্থিরতা, অপোগাণ্ডের প্রমাদ তাকেও ছুঁয়ে যায়। তাই কবিতায় পাঁচ আসে, পাঁচ কাঁদে। মনের জমিতে বর্গীরা হানা দেয়। প্রতিটি মননশস্যের গায়ে বর্গীর চাবুকের চিহ্ন। কবি সুমন এ বেদনাকে রক্ত-মাংসের শরীরে নয়, বহন করে চলেন কবিতার পেলব শরীরে। অকপট কবি ‘অলকানন্দা শহরে’ ঘুরতে ঘুরতে ব্যক্ত করে ফেলেন নিজের হাজারো অব্যক্ত কথার ইতিহাস। তার সে ইতিহাসে প্রথম কাব্যগ্রন্থটিও জমে ক্ষীর হয়ে যায়।

আরও পড়ুনআকাশে উড়িয়ে দেবো শোক: নিরীক্ষাধর্মী কাব্য 

বানান প্রমাদের ত্রুটি প্রথম কাব্যশস্যে তুষের আগুন জ্বালালেও পরবর্তী সংস্করণে তা অল্প মনোযোগেই হয়ে উঠবে তুষার-সফেদ। আনন প্রকাশনীর এ বইটা দীর্ঘ পথযাত্রায় সূচনার পদক্ষেপ মাত্র। আশা করি একদিন হাঁটতে হাঁটতে তা পৌঁছে যাবে আসাম-বেঙ্গল রেললাইন হয়ে বিশ্বসভার কেন্দ্রবিন্দুতে। সুমনের জয় হোক।

এসইউ