রাজনীতি

ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে ৭ খাতে অগ্রাধিকার ঘোষণা বিএনপির

ভঙ্গুর হয়ে পড়া জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ঋণনির্ভরতার পরিবর্তে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও নতুন সম্পদ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। এর অংশ হিসেবে শিল্প ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের নির্বাচনি ইশতেহার উপস্থাপন করেন। ইশতেহারে ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় বিএনপির স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।

ইশতেহার অনুযায়ী, অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিএনপি যে সাতটি খাতে অগ্রাধিকার দেবে সেগুলো হলো: অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ, বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কার, শিল্পখাত ও সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়ন, সেবাখাত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও পরিবহন খাত উন্নয়ন, আইসিটি খাত এবং নতুন শিল্পায়ন কৌশল বাস্তবায়ন।

অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ ও অলিগার্কিক কাঠামো ভাঙার অঙ্গীকার

বিএনপি তাদের ইশতেহারে জানিয়েছে, প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল সক্ষমতার ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। অর্থনীতিতে অলিগার্কিক কাঠামো ভেঙে সম্পদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ, ন্যায্য মূল্যবণ্টন ও বাজারে সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

মধ্যবিত্ত সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান

উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, মানসম্মত আবাসন ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। ঋণনির্ভরতার পরিবর্তে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি চালুর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টিকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

২০৩৪ সালের মধ্যে আধুনিক উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ

ইশতেহারে বলা হয়, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোবে বিএনপি। এজন্য রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি গতিশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে।

শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ

নতুন শিল্পায়ন কৌশলের আওতায় অভ্যন্তরীণ শিল্পভিত্তি শক্তিশালীকরণ, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বন্ধ শিল্প পুনরায় চালু করা, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কথাও বলা হয়।

এছাড়া, ‘ন্যাশনাল ট্রেড কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল’, ‘কৌশলগত টেক্সটাইল ফান্ড’, ‘ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ এবং ‘ন্যাশনাল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।

সৃজনশীল অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন

সৃজনশীল অর্থনীতিকে জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করে শিল্পে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গঠন, জাতীয় ব্র্যান্ড তৈরি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তহবিল এবং নারী-নেতৃত্বাধীন হস্তশিল্প উদ্যোক্তা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। ‘এক অঞ্চল এক পণ্য’ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবনের ঘোষণাও দেওয়া হয়।

ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ ও ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ সমাধান, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতায়ন, ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্তি এবং অবসায়িত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

পুঁজিবাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগ

পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, কারসাজি বন্ধ, করপোরেট বন্ড ও সুকুক চালু, প্রবাসীদের জন্য ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে, ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। দ্রুত বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ‘বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আদালত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক সংযোগ

বাণিজ্য সহজীকরণ, অর্থনীতি উদারীকরণ, ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) সম্পাদন, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সংযুক্তি এবং লজিস্টিকস হাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি।

প্রশাসন সংস্কারের মাধ্যমে মধ্যমেয়াদে রাজস্ব ১০ শতাংশ বৃদ্ধি

প্রশাসন সংস্কারের মাধ্যমে মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ রাজস্ব বাড়ানো হবে বলে ইশতেহারে জানিয়েছে বিএনপি । ভ্যাট সমন্বয় এবং তামাক ও দূষণকারী জ্বালানিতে কর দিয়ে জিডিপির অতিরিক্ত ২ শতাংশ আয়, উচ্চবিত্তদের করজালে আনা, ডিজিটাল অডিট এবং বৈষম্যমূলক কর ছাড় বাতিল করার কথা ইশতেহারে জানিয়েছে বিএনপি।

এছাড়া, মেগা প্রকল্পে সংসদীয় নজরদারি ও ব্যয়-লাভ বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা,  শ্রমঘন, ক্ষুদ্র শিল্প ও সবুজ অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো,শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিতে ব্যয় বাড়িয়ে দক্ষ জনশক্তি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।

বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্র সক্রিয়করণ, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি করভিত্তির প্রাকৃতিক সম্প্রসারণ, উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধি ভ্যাট ও পরোক্ষ করের বৃদ্ধি, কর ছাড় সংস্কারের মাধ্যমে প্রণোদনা থেকে রাজস্ব ক্ষয় বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।

এসএম/এএমএ