দেশজুড়ে

পঞ্চগড়-১ আসনে লড়াই হবে ধানের শীষ-শাপলা কলির প্রার্থীর

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে উত্তরের প্রান্তিক জেলা পঞ্চগড়ের রাজনীতির মাঠ। দিন শেষে জেলার দুইটি আসনেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীর লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন সাধারণ ভোটাররা। বিশেষ করে পঞ্চগড়-১ আসনে সবার নজর এখন দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর দিকে।

এই আসনটিতে বিএনপি মনোনীত অভিজ্ঞ রাজনীতিক নওশাদ জমিরের দলীয় ভিত্তি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে ১১ দলীয় জোটের সারজিস আলমের তারুণ্যের শক্তি। তবে এই দুই প্রার্থী ছাড়াও ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাসদের নাজমুল হক প্রধান।

পঞ্চগড়ের দুইটি সংসদীয় আসনের মধ্যে বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড়-২ আসন এবং তেঁতুলিয়া, আটোয়ারী ও সদর উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড়-১ আসন। দুইটি নির্বাচনি আসনেই চলছে এখন শেষ মুহূর্তে হিসেব-নিকেশ। দুইটি আসনেই বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মধ্যে হতে পারে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

দুইটি আসনের মধ্যে পঞ্চগড়-১ আসনে সাত প্রার্থীর মধ্যে ভোটের মাঠে অন্য চার প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের মাহাফুজার রহমান, বিএসপির আব্দুল ওয়াদুদ বাদশা, ন্যশনাল ফ্রন্টের সিরাজুল ইসলাম, লেবার পার্টির ফেরদৌস আলমকে প্রচারণায় তেমন সক্রিয় দেখা না গেলেও অভিজ্ঞ বনাম তারুণ্যের এই লড়াইয়ে বেশ জমে উঠেছে পঞ্চগড়-১ আসনের ভোটের মাঠ।

এই আসনের তিন উপজেলার ১৫৫টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫৮ হাজার ২৬০ জন। এদের মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ জন। এছাড়া পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটে অংশ নিয়েছেন ৪ হাজার ৮৯৮ জন ভোটার। এছাড়া এই আসনে হিন্দু ভোটর রয়েছেন ৭৫ থেকে ৮০ হাজার এবং তরুণ ভোটার সংখ্যা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার।

আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে এখানে নারী ভোটারের পাশাপাশি তরুণদের ভোট বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের। এছাড়া নির্বাচনে না থাকলে আওয়ামী লীগের ভোটারদেরও একটা ভূমিকা থাকবে এই নির্বাচনে। তবে আওয়ামী লীগের ভোটারদের রায় নিজেদের পক্ষে নিতে একাধিক প্রার্থীকেই নানান কৌশলে সক্রিয় হতে দেখা গেছে।

নব্বইয়ের গণআন্দোল পরবর্তী এই আসনে ১৯৯১ সালে বিএনপি প্রার্থী মরহুম মির্জা গোলাম হাফিজ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও বিএনপির ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার নির্বাচিত হন। এরপর আসনটি হাতছাড়া হয়ে ২০০৮ আওয়ামী লীগের মজাহারুল হক প্রধান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে জাসদের মশাল প্রতীক নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধান জয়লাভ করেন। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মো. মজাহারুল হক প্রধান আবার সংসদ সদস্য হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া মুক্তা।

এবারের নির্বাচনে দীর্ঘদিনের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ নওশাদ জমির। প্রতীক পেয়েই তিনি কোমর বেধে নেমেছিলেন ভোটের মাঠে। প্রতিদিন একের পর এক সভা-সমাবেশ, উঠোন-বৈঠকসহ ইউনিয়ন থেকে গ্রাম পর্যায়ে ভোটারদের কাছে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট এবং দোয়া চেয়েছেন। এর আগে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময় তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা ঘরে ঘরে-জনেজনে কর্মসূচীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাঁনোর চেষ্টা করেছেন। এছাড়া প্রচারণার শেষ পর্যায়ে তার বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার বার্ধক্যকে জয় করে ছেলের জন্য মাঠে নেমেছেন। তিনিও নওশাদ জমিরের সভা-সমাবেশে উপস্থিত থেকে ধানের শীষে ভোট ও দোয়া প্রার্থনা করছেন। তিনি মাঠে নামার পর ধানের শীষের প্রচারণায় যেন নতুন শক্তি সঞ্চয় হয়েছে। তার সঙ্গে এলাকার অনেক প্রবীণ বিএনপি নেতাকেও নওশাদ জমিরের জন্য নির্বাচনের মাঠে নামতে দেখা গেছে। নানামুখী উন্নয়নসহ দীর্ঘদিন দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে এলাকায় বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে বর্ষীয়ান রাজনীতিক মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের। ছেলের জন্য বাবার এই প্রচারণা ধানের শীষের বিজয়ে সহায়ক হবে বলে নওশাদের কর্মী-সমর্থকদের আশা। সব মিলিয়ে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী ধানের শীষের মুহাম্মদ নওশাদ জমির।

কেন্দ্রীয় বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক ও পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মুহাম্মদ নওশাদ জমির বলেন, আমরা এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা করেছি। পৌরসভার বিষয়ে মাস্টার প্ল্যান করেছি। আমরা বিশ্বাস করি আগামীতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করবে এবং পঞ্চগড়ে এর ব্যতিক্রম হবে না। আমরা সুযোগ পেলে জেলার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা, সড়ক যোগযোগ. বিশেষ করে এলাকার বেকার সমস্যা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করবো। জেলায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ পঞ্চগড়কে সুশাসনের মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করবো।

অন্যদিকে বিএনপির ভোট ব্যাংকে ভাগ বসাতে এবং তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে ভোটের মাঠে শুরু থেকেই লেগে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের আলোচিত মুখ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি এনসিপির হয়েই মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। তবে জোটের সুবাদে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের শরীকদের আন্তরিকতায় শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে ভোটে জয় পেতে বেশ তৎপর দেখা গেছে সারজিজ আলমকে। কারণ, বিগত ১৭ বছরে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর দমন-পীড়নের প্রতিকূল পরিবেশেও পঞ্চগড়ে জামায়াতে ইসলামীকে আরও সংগঠিত হতে দেখা গেছে।

ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীরও তৈরি হয়েছে মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি। বৃদ্ধি পেয়েছে কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা। গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী এই আসনে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থীও ঘোষণা করে। তবে এর বেশ আগে থেকেই কেন্দ্রের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে জেলা জামায়াতে আমির ইকবাল হোসাইন তৃণমূল থেকে শুরু করে এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করেন। সাধারণ মানুষের কাছে যান। দিনরাত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে জোটের কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়পত্র দাখিল না করে দলীয় নির্দেশনা মেনে সারজিস আলমকে সমর্থন দেন। এরপর থেকে শাপলা কলির প্রার্থী সারজিস আলম তাকে আর সঙ্গছাড়া করেননি। সারজিস আলমের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনি সভায় জামায়াতে ইসলামী জেলা আমির ইকবাল সোসাইনকে তার পাশে দেখা গেছে।

এছাড়া মরহুম শফিউল আলম প্রধানের জেলা জাগপা, খেলাফত মজলিশসহ অন্য দলের কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের নিয়ে তারুণ্যের শক্তির জয়ের বিষয়ে দারুণ আশাবাদী সারজিস আলমও।

জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও ১১ দলীয় জোটের শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী সারজিস আলম বলেন, এখানে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রত্যেকটি দলের ভোট ব্যাংক রয়েছে। জামায়াতসহ জোটের অন্যান্য দলগুলোর নেতাকর্মীরা বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। আমরা তৃণমূল পর্যায়ে উঠান বৈঠক, পথসভা করেছি, মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সভা সমাবেশে তরুণ ও নারী ভোটারসহ সাধারণ ভোটারদের বেশ সাড়া পেয়েছি।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ পুরাতন ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে, ইনসাফের জায়গায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তারা ইতিবাচক পরিবর্তন চায়। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী মানুষ এখন সব বুঝে গেছে কারা রাজনীতির নামে অপরাজনীতি করে। গুণগত একটা পরিবর্তনের জন্যই সব শ্রেণীর মানুষ আমাদের ভোট দেবে। এখানে আমরা নির্বাচিত হলে মাদক, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করবো। এলাকার স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সড়ক যোগাযোগসহ সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবো।

এসএইচএ/এনএইচআর/এমএস