লাইফস্টাইল

অফিসে ক্রেডিট চুরি? চুপ থাকবেন নাকি বলবেন

আপনি রাত জেগে প্রেজেন্টেশন তৈরি করলেন, সময় নিয়ে আইডিয়া দিলেন, টিমের কাজের বেশির ভাগই দায়িত্বসহকারে আপনি করলেন কিন্তু মিটিংয়ে গিয়ে দেখলেন আপনার সিনিয়র বা বস সেই কাজের ক্রেডিট আপনাকে সরাসরি না দিয়ে পুরো টিমের অথবা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। এটা দেখে আপনার মন খারাপ লাগছে। তবে আপনি চুপ আছেন, কারণ চাকরি দরকার, পরিবেশ নষ্ট করতে চান না, কিংবা ভাবলেন ‘একদিন ঠিক বুঝবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো এই চুপ করে থাকা কি সত্যিই নিরাপদ? নাকি এটা ধীরে ধীরে আপনার ক্যারিয়ারের ক্ষতি করছে?

ক্রেডিট চুরি আসলে কী?

ক্রেডিট চুরি মানে শুধু আপনার নাম না বলা নয়। এর অনেক রূপ আছে আপনার আইডিয়াকে ‘আমাদের টিমের চিন্তা’ বলে উপস্থাপন করা। আপনার কাজ অন্যের নামে রিপোর্টে তুলে দেওয়া। ক্লায়েন্ট বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে আপনার অবদান গোপন করা। সাফল্যের সময় সামনে থাকা, ব্যর্থতার সময় দায় চাপানো। এগুলো একবার হলে দুর্ঘটনা হতে পারে। কিন্তু বারবার হলে এটা স্পষ্টতই প্যাটার্ন।

কেন বস বা সিনিয়ররা এমন করেন?

সব বস খারাপ নন, কিন্তু কিছু বাস্তব কারণ আছে। যেমন-

ইগো ও ক্ষমতার ভয়: অনেক বসই চান না, তাদের অধীনে কেউ বেশি আলোচনায় আসুক। নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা: উর্ধ্বতনদের কাছে নিজেকে অপরিহার্য প্রমাণ করতে তারা অন্যের কাজ নিজের নামে দেখান। কর্মীর নীরবতা: যারা প্রতিবাদ করেন না, তাদের কাজ নেওয়া সবচেয়ে সহজ। সংগঠনের অসুস্থ সংস্কৃতি: কিছু অফিসে কৃতিত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতিই নেই। চুপ করে থাকার ক্ষতি কোথায়?

অনেকে ভাবেন, চুপ থাকলে অন্তত চাকরিটা থাকবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিটা বড়-

আপনার কাজের কোনো লিখিত বা দৃশ্যমান প্রমাণ থাকে না প্রমোশন বা মূল্যায়নের সময় আপনি পিছিয়ে পড়েন আত্মবিশ্বাস কমে যায় একসময় নিজের কাজের মূল্য নিজেই ভুলে যান সবচেয়ে বড় কথা, অফিস ধীরে ধীরে আপনাকে ‘হার্ডওয়ার্কিং কিন্তু অদৃশ্য’ কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করে। তাহলে কি সরাসরি প্রতিবাদ করবেন?

সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়া সব সময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এখানে দরকার কৌশল। প্রথমেই নিজের কাজ দৃশ্যমান করুন। প্রতিবাদ করার আগে নিশ্চিত করুন আপনার কাজের প্রমাণ আছে। ইমেইলে কাজের আপডেট দিন। রিপোর্টে নিজের নাম যুক্ত রাখুন। মিটিংয়ে সংক্ষেপে নিজের অবদান উল্লেখ করুন। প্রেজেন্টেশনে ‘আমার করা অংশ’ স্পষ্ট করুন। এটা অহংকার নয়, এটা পেশাদারিত্ব।

দ্বিতীয়ত বসের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলুন। পাবলিকলি নয়, একান্তে। অভিযোগের ভাষায় নয়, বাস্তব উদাহরণ দিয়ে। যেমন- ‘গত প্রেজেন্টেশনে আমার কাজের অংশটা যদি উল্লেখ করা হতো, তাহলে আমি আরও মোটিভেটেড থাকতাম।’ কারণ অনেক সময় বস বুঝতেই পারেন না আপনি কেমন অনুভব করছেন।

তৃতীয়ত টিমওয়ার্কের ভাষা ব্যবহার করুন। ‘আপনি আমার ক্রেডিট নিলেন’ বলার চেয়ে বলুন ‘আমার কাজটা যদি ভবিষ্যতে স্পষ্টভাবে শেয়ার করা হয়, তাহলে টিমের সবার জন্য ভালো হবে।’ এতে আক্রমণ কম হয়, সমাধানের সুযোগ বাড়ে।

চতুর্থত নিজের সীমা ঠিক করুন। যদি বারবার একই ঘটনা ঘটে- অতিরিক্ত কাজ নেওয়ার আগে ভাবুন। মৌখিক কাজের বদলে লিখিত নির্দেশনা নিন। গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজের নাম যুক্ত করা নিশ্চিত করুন। নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার কোনো মানে নেই।

আরও পড়ুন: দীর্ঘ কর্মঘণ্টা উৎপাদনশীলতা বাড়ায় নাকি ঝুঁকিতে ফেলে? চাহিদার চাপে নয়, বুদ্ধির ব্যবস্থায় বাঁচুন কখন চুপ না থাকাই ভালো? আপনার প্রমোশন আটকে যাচ্ছে অন্য কেউ আপনার কাজের পুরস্কার পাচ্ছে আপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে রাখা হচ্ছে এক্ষেত্রে এইচআর বা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা যৌক্তিক হতে পারে, তবে প্রমাণ ছাড়া নয়। কখন চাকরি বদলের কথা ভাববেন?

সব অফিস বদলানো যায় না, সব বসও বদলায় না। তবে যদি দেখেন বছরের পর বছর কোনো স্বীকৃতি নেই, আত্মসম্মান ক্ষয়ে যাচ্ছে, কাজের আনন্দ হারিয়ে ফেলেছেন তাহলে সমস্যাটা আপনার নয়, পরিবেশের।

অফিসে ক্রেডিট চুরি শুধু পেশাগত সমস্যা নয়, এটা মানসিক চাপও তৈরি করে। চুপ থাকা কখনো কখনো কৌশল হতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী সমাধান নয়। আবার অযথা আগ্রাসী হওয়াও বিপজ্জনক। সঠিক সময়, সঠিক ভাষা আর সঠিক কৌশল এই তিনটাই আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। মনে রাখবেন, আপনি যদি নিজের কাজের মূল্য না দেন, অন্য কেউ দেবে না।

তথ্যসূত্র: এমি গ্যালো, ব্রেক দ্য ফ্রেম

জেএস/