আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ গোলার্ধজুড়ে ২০২৬ সালের শুরুতেই রেকর্ড তাপমাত্রা-ভয়াবহ দাবানল

আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ দক্ষিণ গোলার্ধের বিভিন্ন দেশে ২০২৬ সালের শুরুতেই রেকর্ড তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, সামনে আরও চরম তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে এবং ২০২৬ সাল আবারও বৈশ্বিক উষ্ণতার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। এর আগের তিন বছরই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর।

জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার ওপর একটি ভয়াবহ ‘হিট ডোম’ তৈরি হয়, যেখানে তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। একই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম ও ভয়াবহ দাবানল দেখা দেয়। আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়ার দুর্গম এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং চিলির উপকূলীয় শহরগুলোতে দাবানলে অন্তত ২১ জন নিহত হন। দক্ষিণ আফ্রিকাও সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে পৃথিবী দুর্বল ‘লা নিনা’ প্রভাবের মধ্যে থাকলেও (যা সাধারণত কিছুটা শীতলতা আনে), তবুও তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন প্রকৃতির স্বাভাবিক ওঠানামাকেও ছাপিয়ে গেছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী থিওডোর কিপিং বলেন, ভবিষ্যতে যদি ‘এল নিনো’ পর্যায়ে প্রবেশ করা হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে চরম তাপপ্রবাহের ঘটনা আরও বাড়বে।

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া ও জলবায়ু দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য ছিল এই উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও বেশিরভাগ দাবানল মানুষের কর্মকাণ্ড থেকেই শুরু হয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী গরম, খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা এসব আগুনকে আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক বনাঞ্চল এত গরম ও শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকার উপযোগী নয়, ফলে আগুন আরও বড় ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে।

আর্জেন্টিনার লস আলেরসেস ন্যাশনাল পার্কে সাম্প্রতিক দাবানল এর উদাহরণ। ইউনেস্কো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানে তিন হাজার বছরের বেশি বয়সী গাছ রয়েছে। বজ্রপাত থেকে আগুনের সূত্রপাত হলেও পরে তীব্র তাপপ্রবাহ ও বাতাসের কারণে তা একদিনেই প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

চিলির দক্ষিণাঞ্চলেও দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কনসেপসিওনের আশপাশের এলাকায় শত শত বাড়ি পুড়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় রেকর্ড গরমের ফলে ২০১৯-২০ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায়ও গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন আগুনের মৌসুম চলছে, যা বন্যপ্রাণী ও পর্যটন এলাকাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দাবানলের ঝুঁকি কমাতে শহরের আশপাশে উদ্ভিদ ব্যবস্থাপনা, কার্যকর সরিয়ে নেওয়ার (ইভাকুয়েশন) পরিকল্পনা এবং আগুন প্রতিরোধী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার জরুরি।

এদিকে দাবানলের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতিও দ্রুত বাড়ছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে দাবানলজনিত বীমাকৃত ক্ষতি ছিল প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গড় ছিল বছরে মাত্র ৪ বিলিয়ন ডলার।

থিওডোর কিপিং বলেন, এ ধরনের বিশাল ও তীব্র দাবানল অনেক সময় ঠেকানোই যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন সীমিত করার জন্য এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।

সূত্র: রয়টার্স

এমএসএম