মতামত

নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সশস্ত্র বাহিনী

এমন শান্তিপূর্ণ, রক্তপাতহীন, তুলনামূলকভাবে অবাধ একটি জাতীয় নির্বাচন—বাংলাদেশের মানুষ শেষ কবে দেখেছে, সেটি সত্যিই গবেষণার বিষয়। ভোটের আগে নানা আশঙ্কা ছিল। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সহিংসতা, জঙ্গি হামলা, এমনকি সেনাশাসন ফিরে আসার মতো গুজবও ছড়ানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব চ্যানেল এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত কিছু প্রচারমাধ্যমে এমন সব বিশ্লেষণ প্রচারিত হয়েছে, যা মানুষের মনে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। কিন্তু দিনশেষে বাস্তবতা আমাদেরকে ভিন্ন চিত্র দেখাল।

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ। ভোটাররা কেন্দ্রে গেছেন, ভোট দিয়েছেন, এবং বড় ধরনের সহিংসতা বা রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি। এই বাস্তবতার পেছনে যে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বেশি নজরে ছিল, সেটি হলো বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী—বিশেষ করে সেনাবাহিনী।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচনকে ঘিরে সন্দেহ ও আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা হয়েছে। কেউ বলেছে, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। কেউ বলেছে, জঙ্গি হামলার আশঙ্কা আছে। কেউ আবার দাবি করেছে, সেনাবাহিনী রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হবে।

ভারত ও কলকাতাভিত্তিক কিছু গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশের কিছু ইউটিউবভিত্তিক বিশ্লেষক বিদেশের মাটিতে বসে এমন সব পূর্বাভাস দিয়েছেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের একাংশ বিভ্রান্ত হন। কিন্তু আশার কথা হল, সার্বিক নির্বাচন প্রক্রিয়া দেখিয়েছে—গুজবের চেয়ে বাস্তবতা শক্তিশালী। সেনাবাহিনী মাঠে ছিল, কিন্তু তারা ভোটের প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেনি। তাদের উপস্থিতি ছিল নিরাপত্তার জন্য, প্রভাব বিস্তারের জন্য নয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রায় ২০০টি ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হয়। দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল, মোবাইল টহল, সমন্বিত কন্ট্রোল রুম—সব মিলিয়ে একটি পরিকল্পিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা হয়।

এই প্রস্তুতির লক্ষ্য ছিল সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধ করা এবং ভোটারদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সেনাবাহিনীর এই বিশাল উপস্থিতি কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি করেনি। বরং অনেক ভোটার বলেছেন, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি তাঁদের কেন্দ্রে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার কর্তৃত্ব পরান শাসনের ফলে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিছু কর্মকর্তার আচরণ বা কিছু সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বাহিনীকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে এবারের নির্বাচন ছিল তাদের জন্য ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সুযোগ।

আজকের নির্বাচনে সেনাবাহিনী আচরণ ছিল সংযত ও আইনসম্মত। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে তারা কাজ করেছে। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে হস্তক্ষেপ করেনি। শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছিল প্রয়োজনীয়তা ও সামঞ্জস্য নীতির অনুসরণ। যা দেখিয়েছে যে প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্ব ব্যক্তিগত আচরণের ঊর্ধ্বে।

একটি বড় প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করতে হলে সামগ্রিক আচরণ দেখতে হয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে নয়।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ইতিবাচক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার নিরাপত্তা কাঠামো অপরিহার্য।

সেনাবাহিনী এর আগে বিভিন্ন জাতীয় সংকটে নিরপেক্ষ ভূমিকার উদাহরণ রেখেছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের সুনামও প্রমাণ করে যে তারা পেশাদার মানদণ্ডে কাজ করতে সক্ষম। ফলে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তায় তাদের নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকার বিকল্প ছিল না।

এই নির্বাচনের সাফল্যের পেছনে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক প্রস্তুতি, বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত কাজও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সত্য স্বীকার করতেই হবে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্বাচন সফল হয় তখনই, যখন সব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ সাংবিধানিক সীমার ভেতরে থেকে কাজ করে। এবারের নির্বাচনে সেই সমন্বয়ের চিত্র দেখা গেছে।

এই নির্বাচন আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে, গুজব ও অপপ্রচার বাস্তবতার বিকল্প নয়। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে মাঠে পেশাদার আচরণ দেখাতে হয়।

সেনাবাহিনী দেখিয়েছে, তারা রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান—কোনো রাজনৈতিক পক্ষের নয়। এই অবস্থান ভবিষ্যতের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ,আস্থা ধরে রাখা আরও বড় দায়িত্ব। একটি সফল নির্বাচন যেমন ইতিবাচক বার্তা দেয়, তেমনি প্রত্যাশাও বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং ভবিষ্যতেও এই নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাষ্ট্রের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ছিল একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা বলছে, সশস্ত্র বাহিনী নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে।

গণতন্ত্রের পথ সব সময়ই দীর্ঘ, কিন্তু আস্থা থাকলে সেই পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যায়। এবারের নির্বাচন সেই আস্থাকে বহুলাংশে পুনরুজ্জীবিত করেছে।

লেখক: সাংবাদিক,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।

ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

এইচআর/এএসএম