দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বড় সফলতার মুখ দেখলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছেন তাদের প্রার্থীরা। জোটের হিসাবে সেই সংখ্যা ৭৭। কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চল ও কক্সবাজারে বড় ধাক্কা খেয়েছে তারা। ২৩টি আসনের মধ্যে পেয়েছে মাত্র দুটি। প্রভাবশালী একাধিক প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। কয়েকজনের জামানত বাজেয়াপ্তও হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে কেবল দক্ষিণের চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া) ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াত প্রার্থীরা। বাকি প্রায় সব আসনে ভরাডুবি ঘটেছে। কক্সবাজারের চারটি আসনে পরাজিত হলেও দুটি আসনে ব্যবধান ছিল তুলনামূলক কম। সেই সঙ্গে তিন পার্বত্য জেলার তিন আসনে বড় ব্যবধানে হার হয়েছে।
ধর্মীয় ভোটব্যাংকে ভাঙনস্থানীয় রাজনীতি সূত্রে জানা গেছে, কওমি ও সুন্নি (মাজার-খানকাপন্থি) ঘরানার ভোটব্যাংকের বড় অংশ জামায়াতের পক্ষে যায়নি। কয়েকটি আসনে সুন্নি ধারার আলাদা প্রার্থী থাকায় ভোট বিভক্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও জামায়াতকে ঠেকাতে ভোটারদের একটি অংশ কৌশলগতভাবে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেন।
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম-২) আসনে সুন্নি জোটের প্রার্থী শাহজাদা সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারি জামানত হারান। ওই আসনে বড় ব্যবধানে জয় পান বিএনপির সরওয়ার আলমগীর। এছাড়া, নির্বাচনের আগে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াতবিরোধী অবস্থান নেওয়াও ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
ব্যাংকের চাকরি হারানো ইস্যুচট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ডা. ফরিদুল ইসলাম ২১ হাজার ৭০৬ ভোট পেয়ে জামানত হারান। স্থানীয়ভাবে এ ফলাফল বিশেষভাবে আলোচিত। এর পেছনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে সম্প্রতি পটিয়ার অনেকের চাকরিচ্যুতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জোট সমঝোতা ও আসন ছাড়জোটগত সমঝোতায় কয়েকটি আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জামায়াতের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এলডিপি) ছেড়ে দেওয়া একটি আসনে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের ছেলে শেষ দিকে এগিয়ে থেকেও পরাজিত হন।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে পরিচিত মুখ জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাছের জোটগত সমন্বয় জটিলতার কারণে শেষ সময়ে প্রচারণা কমিয়ে দেন। পরে জোটের প্রার্থী পরিবর্তন হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবু তিনি উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকেন। আর জোটের নতুন প্রার্থী খুব কম ভোট পেয়ে জামানত হারান।
হাটহাজারী আসনে খেলাফত মজলিস প্রার্থীও পরাজিত হন। যদিও এলাকাটি হেফাজত ঘনিষ্ঠ বলয় হিসেবে পরিচিত। এসব কারণে এতে ভোটের সমীকরণ পাল্টে যায়।
প্রার্থী বাছাইয়ে দুর্বলতামহানগরীর চার আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে জামায়াত কৌশলগত দক্ষতা দেখাতে পারেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চট্টগ্রাম-৯ আসনে নতুন মুখ ডা. ফজলুল হককে প্রার্থী করা হয়, যা মাঠপর্যায়ে খুব সাড়া ফেলেনি। নাগরিকত্ব ও কম প্রচারণা নিয়ে তিনি নেতিবাচক আলোচনায় ছিলেন।
চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়েন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী শফিউল আলম। চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমানের কাছে হেরে যান জামায়াতের নেতা শামসুজ্জামান হেলালী।
নেতারা যা বলছেনস্থানীয় জামায়াত নেতা রাশেদুল মোস্তফা বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভোটারদের বড় অংশ ধর্মভিত্তিক ধারা ও অনুসারী গোষ্ঠীর প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কওমি আলেম ও তরিকতপন্থিদের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। তার অভিযোগ, এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে মাদরাসাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে- কওমি মহলে এমন বার্তা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, তরিকতপন্থি ও সুন্নি অনুসারীদের কাছে মাজার ও খানকা নিয়ে নেতিবাচক আশঙ্কা ছড়ানো হয়।
রাশেদুল বলেন, হেফাজতের আমির মাওলানা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বিএনপির পক্ষে অবস্থান নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন, যা ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশও কৌশলগত কারণে বিএনপি প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
চকবাজার জামায়াত নেতা ইফতেখার কাউনাইন বলেন, বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক ক্লাব, সংগঠন, মসজিদ ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে ভোটার ব্যবস্থাপনায় বিএনপি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। বিপরীতে নগরের কয়েকটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী বাছাই ছিল দুর্বল। চট্টগ্রাম-৯ আসনে নতুন মুখ ফজলুল হককে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রতিপক্ষের প্রচারণায় তার বিদেশি নাগরিকত্বের প্রসঙ্গ সামনে আসে, যা ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। পাশাপাশি পেশাগত কারণে তিনি মাঠে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি।
এমআরএএইচ/একিউএফ/এমএস