২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর অবস্থা, অর্থনৈতিক সংকট, বিক্ষোভ-আন্দোলন, বেসামাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হাঁসফাঁস অবস্থা হয়েছিল সাধারণ মানুষের। ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকার সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে তুলে আনার চেষ্টা করলেও সবাই তাকিয়ে ছিল গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারের দিকে। অবশেষে ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের নতুন অভিভাবক পেলো বাংলাদেশ।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করলো। গঠিত হয়েছে মন্ত্রিসভা। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, প্রশাসনিক বিন্যাস ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দ্রুত পরিবর্তনের আভাস মিলছে। সরকার পরিবর্তনের এমন সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, কারণ মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং প্রত্যাশা-বাস্তবতার টানাপোড়েন সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ফলে নতুন সরকারের জন্য শাসন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে অবস্থান করে। রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং মাঠপর্যায়ের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারিত হওয়ায় স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করে।
তারা বলছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম এই নির্বাচনে বড় ম্যান্ডেট পাওয়া দলটির ওপর তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার চাপও থাকবে বেশি। এছাড়া ৫ আগস্টের পর যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে এবং কারাগার থেকে আসামি পালিয়ে গেছে তাদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ থাকছেই।
আরও পড়ুন:
নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে
অভিজ্ঞ-তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে কার্যকরী মন্ত্রিসভা
বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, উত্তরণে চাই সুশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অর্থনীতিও সচল থাকতে পারে না। শিল্পকারখানা, বন্দর, পরিবহন সবকিছুই নিরাপদ পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান। দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া ও অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলে মত দিচ্ছেন অনেকেই।
১৮ মাসে নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিজুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর গত ১৮ মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে অনেকের। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ, ‘মব’ সহিংসতা, দখলদারি ও অবরোধের মতো ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, রাস্তা অবরোধ ও সহিংসতার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা তৈরি ও জনআস্থা অর্জন করা।
রাজনীতির মাঠে রদবদল হওয়ায় বাড়ে অপরাধ প্রবণতাক্ষমতার পালাবদলের পর স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত, দখল বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঝুঁকি আছেই। অতীতে এ সময়গুলোতে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে তা বিস্তৃত অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা পূর্বশর্ত।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ভোটের পর মুন্সিগঞ্জে সহিংস ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। একইভাবে বাগেরহাটেও সহিংসতায় একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সিলেট, কুমিল্লা, নরসিংদী, ফেনী, গাজীপুর, নাটোর, ঝালকাঠি, নড়াইল, পাবনা, বগুড়া, ফরিদপুর, বরগুনা, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় হামলার ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন পরবর্তী দুই দিনে ৩০টি জেলায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সহিংসতায় মুন্সিগঞ্জ ও বাগেরহাটে দুই যুবক নিহত হন। আর ময়মনসিংহে নিহত হয় একটি শিশু। নির্বাচন-পরবর্তী এসব সহিংসতায় ৩৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, ঘরবাড়িতে হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
উদ্ধার হয়নি ১৩ হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্রঅন্তর্বর্তী সরকার বারবার ঘোষণা দেওয়ার পরও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল সেগুলো পুরোপুরি উদ্ধার করা যায়নি। এখনও হদিস না পাওয়া এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদ নিয়ে ভয়-আতঙ্ক রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুণ্ঠিত হয়। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৪৩২টি। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ১৩ হাজার ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র। এছাড়া লুণ্ঠিত গোলাবারুদের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি ২ লাখের বেশি গোলাবারুদ।
৭০০ জেল পলাতক আসামি এখনও অধরাকারা অধিদপ্তর সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ও পরে দেশের কয়েকটি কারাগারে বন্দিরা বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করেন। এ সময় দেশের পাঁচ কারাগারে চরম বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ করে ২ হাজার ২৪০ বন্দি পালিয়ে যান। হামলাকারীরা কারাগার থেকে ৯৪টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল লুট করেন। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় ছয় বন্দি মারা যান।
পলাতক বন্দিদের মধ্যে জঙ্গি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন, বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পাওয়াসহ বিচারাধীন মামলার আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ২০৩ জন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। এছাড়া পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে ৬৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ৯ জন জঙ্গি রয়েছে। এসব বন্দিকে আইনের আওতায় আনা না গেলে নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে।
অপরাধের ধরনে পরিবর্তনসরকার গঠনের পর শুধু প্রচলিত অপরাধ নয়, সম্প্রতি সাইবার প্রতারণা, সংগঠিত অপরাধচক্র এবং মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ বৃদ্ধি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল জোরদার করা জরুরি।
বাহিনীর সক্ষমতা ও সমন্বয়আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধান দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। মাঠপর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হতে পারে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশকে শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সংস্কারের বিকল্প নেই। এছাড়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে বাহিনীর মধ্যে থাকা বর্তমান কর্মরতদের মধ্য থেকে আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেওয়া গেলে গতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই।
জনআস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্নআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কমানো, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
করণীয় ও নীতিগত দিকবিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট সক্রিয় রাখা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে পুলিশ সংস্কার, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং ডেটাভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। নতুন সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক নয় বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক আস্থার পরীক্ষাও। কার্যকর সমন্বয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা গেলে স্থিতিশীলতার ভিত্তি আরও শক্ত হবে।
আরও পড়ুন:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন সালাহউদ্দিন আহমদ
৫০ জনের মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ ৪১
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দুই খাতে সমন্বিত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ। মনে রাখতে হবে, নিরাপদ সমাজ যেমন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তেমনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয়ের স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য দমন করতে হবে কঠোরভাবে।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, নতুন সরকারের জন্য প্রথম কর্তব্য ১৭ মাস ধরে চলা মব সন্ত্রাস থেকে দেশকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। এটা সরকারের লোকেরাও জানে এবং সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদেরও প্রত্যাশা সরকার গঠনের পরপরেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া পুলিশ বাহিনীকে নৈতিকভাবে ঠিক করা, মনোবল বৃদ্ধি করা এবং কাঠামোগতভাবে বাহিনীকে পুনর্গঠন করা জরুরি।
লুট হওয়া অস্ত্র ও জেল পলাতক আসামি গ্রেফতার ও চাঁদাবাজদের ধরতে নতুন সরকার হয়তো নতুন কোনো অভিযানে নামতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযান সফল হতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দক্ষ এবং মনোবল দৃঢ় হতে হবে।
টিটি/এসএনআর/এমএমএআর