রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে দেশের শিল্পখাতে বিনিয়োগ অনেকাংশে কমেছে। শুধু যে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে তা নয়, আস্থার সংকটে দেশীয় বিনিয়োগও নেমেছে প্রায় তলানিতে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চান শিল্পমালিকরা। ‘মন্দার’ অর্থনীতিতে ফেরাতে চান চাঙ্গা ভাব। এজন্য নতুন সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তারা।
জাগো নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে তৈরি পোশাকখাতের নানান দিক নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক ও সুরমা গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফয়সাল সামাদ। তিনি দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নতুন সরকারের কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা, ব্যাংক সুদের হার কমানো, বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং শ্রমিক কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ফয়সাল সামাদ মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ বিশেষ করে পোশাকশিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাত শুধু রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের প্রধান প্রতিবেদক ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
জাগো নিউজ: ব্যবসায়ী হিসেবে নতুন সরকারের কাছে আপনার প্রধান প্রত্যাশা কী?
ফয়সাল সামাদ: আমরা চাই নতুন সরকার দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিক। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আমরা চাই তিনি আরও বলবেন—‘সবার আগে মেইড ইন বাংলাদেশ’। কারণ, পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। ফলে এ খাতের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করা খুব জরুরি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যেন কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারে।
জাগো নিউজ: ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের সহায়তা চান?
ফয়সাল সামাদ: বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা শিল্পের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদের হার কমানো প্রয়োজন। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।
জাগো নিউজ: গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগ বাড়াতে কী করা দরকার বলে মনে করেন?
ফয়সাল সামাদ: প্রথমেই দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। গত দুই বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ অনেকে কমেছে। যদি জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দেশীয় উদ্যোক্তারাই স্বাভাবিকভাবে নতুন বিনিয়োগ করবেন। বিদেশি বিনিয়োগ তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে।
জাগো নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে কীভাবে এগোনো উচিত?
ফয়সাল সামাদ: সরকার যদি শিল্পখাতের সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে। খাতভিত্তিক আলোচনায় আমাদের অভিজ্ঞতা ও তথ্য কাজে লাগালে এসব চুক্তি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
জাগো নিউজ: শ্রমিক কল্যাণের ক্ষেত্রে সরকারের কাছে আপনারা কী ধরনের সহযোগিতা চান?
ফয়সাল সামাদ: পোশাকশ্রমিকদের জন্য সরকারিভাবে রেশন ব্যবস্থা চালু করা গেলে তা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। এতে শ্রমিকদের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং শিল্পখাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জাগো নিউজ: এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আপনার মতামত কী?
ফয়সাল সামাদ: আমরা এলডিসি উত্তরণ চাই, তবে শিল্পখাত এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এজন্য কিছুটা সময় দেওয়া হলে দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে এবং উত্তরণের সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে।
জাগো নিউজ: ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে আর কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন?
ফয়সাল সামাদ: দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট দমন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসব সমস্যা দূর করা গেলে ব্যবসার পরিবেশ আরও উন্নত হবে এবং শিল্পখাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়বে।
জাগো নিউজ: নতুন সরকারের জন্য আপনার সার্বিক বার্তা কী?
ফয়সাল সামাদ: সরকার যদি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করে, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। এতে অন্য শিল্পখাতগুলোও উপকৃত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
আইআইচও/এমকেআর