দেশজুড়ে

নৌবন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ-কার্গো-ট্রলার চলাচল বন্ধ

ফরিদপুরে পদ্মা নদীতে তীব্র নাব্যতাসংকট দেখা দিয়েছে। ফলে তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে জেলার একমাত্র নৌবন্দর ঘাটটি। ফরিদপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এ নৌবন্দরটি এখন প্রায় অচলাবস্থা।

পদ্মা নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় ডুবোচর। পানি প্রবাহ না থাকায় পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো ও বড় ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যার কারনে থমকে গেছে শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সিঅ্যান্ডবি ঘাট শত বছরের পুরোনো। ২০১৫ সালে এটি সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর ঘোষণা হয়। পদ্মার তীরে অবস্থিত এই বন্দর দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির বন্দরে উন্নীত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর এবং সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনে এ বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। কিন্তু প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় বড় একটি সময় বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ বন্ধের প্রভাব কুলি-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।

সিঅ্যান্ডবি ঘাট নৌবন্দরের বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ নৌবন্দর থেকে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। ডুবোচর ও নাব্যসংকটের কারণে চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রাজস্ব বাড়ছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নৌবন্দরটি ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজ ঘাটে ভিড়তে পারছে না। এতে কুলি-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকা অনেকটা থমকে গেছে। নদীতে চরম নাব্যসংকটের কারণে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কার্যক্রম সচল করতে একমাত্র উপায় দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা।

নৌবন্দরের কুলি-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফরিদপুরের পাট এ নদী বন্দর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রপ্তানি হয়। সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্টবাহী জাহাজ, ভারতের গরু ও চালসহ চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মিরকাদিম থেকে চাল আমদানি হয় এই নৌপথ দিয়ে।

নৌবন্দর ঘাটে দীর্ঘদিন কুলির কাজ করেন মো. রমজান শেখ। তিনি বলেন, এখন একেবারে বেকার অবস্থায় আছি। ঘাটে কাজ করেই আমাদের আয়-রোজগার করতে হয়। ঘাটটি সচল করতে দ্রুত ড্রেজিং করে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।

নৌবন্দর ঘাটের শ্রমিক লালন বলেন, ঘাটে কার্গো ও জাহাজ ভিড়তে না পারায় শ্রমিকদের কাজ নেই। বেকার হয়ে কতদিন বসে থাকা যায়। একেবারে কাজ না থাকায় হাতে টাকা-পয়সা নেই। নিজের চলাচল ও খাওয়া-দাওয়ার সমস্যায় পড়েছি। বাড়িতে ঠিকমতো টাকা-পয়সা পাঠাতে পারছি না। ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে।

মো. নজরুল শেখ নামে আরেক শ্রমিক বলেন, সারা বছর এখানে শ্রমিকের কাজ করি। এই কাজের ওপরই চলে পুরো সংসার। গত কয়েক মাস ধরে জাহাজ, কার্গো, বড় ট্রলার ঘাটে ভিড়তে না পারায় আমাদের কাজও নেই, আয়-রোজগারও নেই। এতে সংসার চালাতে রীতিমতো চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। বড় চিন্তায় আছি।

সিঅ্যান্ডবি ঘাট নৌবন্দরের বর্তমান ইজারাদার মজিবুর রহমান বলেন, এমন পরিস্থিতিতে গড়ে প্রতিদিন ৮০-৯০ হাজার টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সমস্যা তুলে ধরে গত তিন মাসে বিআইডব্লিউটি কর্তৃপক্ষ বরাবর ২৫টি চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং নদীর মধ্যে একটি ড্রেজার মেশিন ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে চলাচলে আরও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থার দাবি জানাই।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক(ডিসি) কামরুল হাসান মোল্লা বলেন, পদ্মায় নাব্যসংকটের কারণে নৌবন্দর চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে খননকাজ শুরু হবে।

এন কে বি নয়ন/এনএইচআর/এএসএম